Monday 13 July 2026
EN
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
EN

রাজকীয় পোশাক ও ব্রোঞ্জের ঘণ্টায় আজ ‘আন্তর্জাতিক টাউন ক্রায়ার্স ডে’

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৩ জুলাই ২০২৬ ১৬:২৬

আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যখন এক ক্লিকেই ব্রেকিং নিউজ বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যায়, তখন কেমন হতো যদি কোনো জরুরি খবর জানতে আমাদের পাড়ার মোড়ে এক ব্যক্তির চিৎকারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো? আজ জুলাই মাসের দ্বিতীয় সোমবার, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর দিন ‘আন্তর্জাতিক টাউন ক্রায়ার্স ডে’ (International Town Criers Day)। আমাদের আধুনিক ‘ডিজিটাল নোটিফিকেশন’-এর আদিপুরুষ ছিলেন যারা, আজ মূলত তাদেরই ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে স্মরণ করার দিন।

চলুন জেনে নেওয়া যাক রাজকীয় রাজপোশাক, হাতে ব্রোঞ্জের ঘণ্টা আর গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করা এই ঐতিহাসিক ‘টাউন ক্রায়ার’দের ভেতরের কিছু দারুণ এবং অজানা গল্প।

বিজ্ঞাপন

ওয়েজ! ওয়েজ! ওয়েজ! চিৎকারের আড়ালে এক রাজকীয় সূচনা

আজ থেকে শয়ে শয়ে বছর আগে যখন ছাপাখানা আবিষ্কার হয়নি, সাধারণ মানুষের সিংহভাগই পড়তে বা লিখতে জানতেন না, তখন রাজা বা সরকারের কোনো নতুন ফরমান, করের নিয়ম, কিংবা যুদ্ধের খবর সাধারণ মানুষকে জানানোর একমাত্র মাধ্যম ছিলেন এই ‘টাউন ক্রায়ার’ বা নগর ঘোষণাকারী।

তারা যখন কোনো ঘোষণা দিতে আসতেন, তখন শুরুতেই উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলতেন ‘ওয়েজ! ওয়েজ! ওয়েজ!’ (Oyez! Oyez! Oyez!)। এটি একটি প্রাচীন ফরাসি শব্দ, যার সহজ অর্থ হলো ‘শুনুন!’ বা ‘মনোযোগ দিন!’। হাতে থাকা ভারী ব্রোঞ্জের ঘণ্টা বাজিয়ে তারা পুরো এলাকার মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করতেন। এরপর রাজকীয় সিলমোহর দেওয়া পার্চমেন্ট কাগজ খুলে রাজার আদেশ পড়ে শোনাতেন। ঘোষণা শেষে কাগজটি তারা এলাকার সবচেয়ে জনবহুল দেয়াল বা সরাইখানার কাঠের খুঁটিতে পেরেক দিয়ে গেঁথে দিতেন। মূলত এই কাজের সূত্র ধরেই কিন্তু আধুনিক সাংবাদিকতায় ‘পোস্টিং এ নোটিশ’ (Posting a notice) বা সংবাদপত্রের পাতাকে ‘পোস্ট’ (Post) বলা শুরু হয়।

রাজার জীবন্ত বুলেটিন ও তাদের অবিশ্বাস্য আইনি সুরক্ষা

মধ্যযুগে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডে, টাউন ক্রায়ারদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তারা সরাসরি রাজপরিবার বা স্থানীয় আদালতের অধীনে কাজ করতেন। তাদের পরনে থাকত লাল এবং সোনালী রঙের জমকালো বিশেষ রাজকীয় কোট, পায়ে বড় বুট জুতো এবং মাথায় তিন কোণা বিশিষ্ট ‘ট্রাইকর্ন’ হ্যাট।

যেহেতু তারা রাজার মুখপত্র হিসেবে কাজ করতেন, তাই তাদের শরীরে আঘাত করা সরাসরি রাজার অবমাননা এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল বলে গণ্য হতো। অনেক সময় যুদ্ধ বা কর বাড়ানোর মতো অপ্রিয় এবং নেতিবাচক খবরও তাদের দিতে হতো, যা শুনে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠত। কিন্তু রাজার কড়া আইনের কারণে কেউ এই ঘোষণাকারীদের গায়ে হাত তোলার সাহস পেত না। ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত প্রবাদ ‘Don’t shoot the messenger’ (বার্তা বাহককে আঘাত কোরো না) মূলত এই টাউন ক্রায়ারদের সুরক্ষার ইতিহাস থেকেই তৈরি হয়েছে।

নিরক্ষরতার যুগে সামাজিক যোগসূত্রের একমাত্র সেতু

আজকের দিনে আমরা ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুক, টুইটার বা নিউজ পোর্টালে চোখ বুলাই। কিন্তু পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের কোনো সাধারণ কৃষক বা শ্রমিকের জন্য সকালের খবর পাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিলেন এই ক্রায়ারেরা।

তারা শুধু কর আদায়ের খবরই দিতেন না; কোনো চোর বা খুনি পালিয়ে গেলে তার বিবরণ, বাজারে কোনো নতুন পণ্যের আগমন, কিংবা কোনো হারিয়ে যাওয়া শিশুর সন্ধানও তারা চিৎকার করে জানাতেন। এক অর্থে, তারা ছিলেন একই সাথে আজকের দিনের রেডিও, টেলিভিশন, খবরের কাগজ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লাইভ স্ট্রিমিং! প্রতিটি ক্রায়ারের গলার আওয়াজ হতে হতো অত্যন্ত জোরালো, স্পষ্ট এবং গম্ভীর, যাতে বাতাসের গতি ভেদ করেও অন্তত এক কিলোমিটার দূর থেকে মানুষের কানে তাদের প্রতিটি শব্দ পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বজুড়ে যেভাবে উদযাপিত হয় আজকের এই দিনটি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বর্তমান এবং শৌখিন টাউন ক্রায়ারদের সংগঠন ‘এন্সিয়েন্ট অ্যান্ড অনারেবল গিল্ড অব টাউন ক্রায়ার্স’-এর উদ্যোগে প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হয়। এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রায়ারেরা তাদের পূর্ণ রাজকীয় পোশাক ও ঘণ্টা নিয়ে একত্রিত হন।

দিনটি উদযাপনে বিভিন্ন শহরে ‘টাউন ক্রায়ার প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করা হয়। সেখানে দেখা হয় কার কণ্ঠস্বর সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট, কার পোশাক কতটা নিখুঁত ঐতিহাসিক নকশার এবং কে কত কম সময়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে বার্তা ফুটিয়ে তুলতে পারেন। অনেক দেশে ক্রায়ারেরা স্থানীয় স্কুলগুলোতে যান এবং নতুন প্রজন্মের শিশুদের কাছে এই প্রাচীন ইতিহাস ও যোগাযোগের বিবর্তন তুলে ধরেন।

ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা আজকের পৃথিবীর বুকে এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যোগাযোগের মূল ভিত্তিটি আসলে মানুষের কণ্ঠস্বর আর একে অপরের মুখোমুখি হওয়া, যা কোনো কৃত্রিম প্রযুক্তি কখনো পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর