Sunday 12 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

২২০০ বছর পর মাটির নিচে পাওয়া এক রহস্যময় প্রাচীন সৈন্যবাহিনী

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ জুলাই ২০২৬ ১৩:২২

মানব ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও কঠোর এক সম্রাট ছিলেন চীনের কিন শি হুয়াং, যিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে রাজসিংহাসনে আরোহণ করে চীনের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন। তার শাসনকালেই আজকের পৃথিবীর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চীনের বিখ্যাত প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল। তবে ক্ষমতার চূড়ায় বসার পর থেকেই এই সম্রাটের অবচেতন মনে এক অদ্ভুত ও গভীর চিন্তা দানা বাঁধতে শুরু করে, যা ছিল মৃত্যুর পরবর্তী জীবন বা পরকালে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার এক অভিনব জেদ। সম্রাট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে ইহকালের মতো পরলোকেও তার সম্রাটের মর্যাদা রক্ষা করার জন্য এবং শত্রুদের হাত থেকে নিজের রাজকীয় কবর পাহারা দেওয়ার জন্য এক বিশাল ও অপরাজেয় সেনাবাহিনীর প্রয়োজন হবে। এই পরম বিশ্বাস ও জেদ পূরণ করতেই তিনি তার মূল রাজপ্রাসাদের অদূরে মাটির নিচে এক বিশাল ও গোপন পোড়ামাটির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার নির্দেশ দেন, যা আজ বিশ্ববাসীর কাছে এক পরম বিস্ময়।

বিজ্ঞাপন

মাটির নিচের অবিশ্বাস্য এক বিশাল রূপকথা

মাটির নিচের এই অবিশ্বাস্য গোপন সাম্রাজ্যে পোড়ামাটি তথা টেরাকোটা দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল প্রায় আট হাজার পদাতিক সৈন্য, একশো ত্রিশটি যুদ্ধরথ এবং পাঁচশো বিশটি শক্তিশালী ঘোড়া। এই পুরাকীর্তির সবচেয়ে বড় রহস্য ও বিস্ময়কর দিক হলো, সেখানে থাকা আট হাজার মূর্তির প্রত্যেকটির উচ্চতা, গায়ের বর্মের নকশা, মাথার চুলের বিন্যাস এবং মুখের অবয়ব সম্পূর্ণ আলাদা এবং একে অপরের সাথে কোনো মিল নেই। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করেন, তৎকালীন সম্রাটের জীবন্ত ও সুদক্ষ সৈনিকদের একে একে সামনে দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্যে এই মাটির মূর্তিগুলো অবিকল তৈরি করা হয়েছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পোড়ামাটির যোদ্ধাদের হাতে যে আসল তলোয়ার, বল্লম ও তীর-ধনুক তুলে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে এমন এক বিশেষ রাসায়নিক প্রলেপ ছিল যে দীর্ঘ বাইশশো বছর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পরও সেগুলোতে বিন্দুমাত্র জং বা মরিচা ধরেনি এবং সেগুলো আগের মতোই ধারালো ছিল।

বাইশশো বছর পর কৃষকদের হাত ধরে পুনরুত্থান

সম্রাটের মৃত্যুর পর ইতিহাসের এই বিশাল ও অবিশ্বাস্য মাটির সৈন্যবাহিনী কালের বিবর্তনে মাটির গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যায়। দীর্ঘ বাইশশো বছরেরও বেশি সময় পর ১৯৭৪ সালে চীনের শানসি প্রদেশের শিআন নামক স্থানে কয়েকজন সাধারণ কৃষক কুয়া খনন করতে গিয়ে মাটির নিচে এই অলৌকিক সভ্যতার সন্ধান পান এবং তাদের হাত ধরেই পৃথিবী আবার এই প্রাচীন বিস্ময় অবলোকন করার সুযোগ পায়। আধুনিক গবেষকদের মতে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে প্রায় সাত লাখ শ্রমিকের দীর্ঘ তিন দশক সময় লেগেছিল এবং এই সৈন্যদের পাশাপাশি সম্রাটের বিনোদনের জন্য মাটির নিচে পোড়ামাটির নর্তকী ও সঙ্গীতশিল্পীদের মূর্তিও তৈরি করা হয়েছিল। আজ এই অনন্য ও কালজয়ী প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সারা বিশ্বের মানুষ এটিকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে ‘বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য’ হিসেবে গণ্য করে।

বর্তমানে কেমন আছে এই মাটির সাম্রাজ্য

আবিষ্কারের পর থেকেই চীনের সরকার এই ঐতিহাসিক স্থানটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করে আসছে। বর্তমানে এই বিশাল প্রত্নতাত্ত্বিক খননক্ষেত্রের ওপর একটি আধুনিক ও সুবিশাল জাদুঘর কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে, যা ’emperor qinshihuang’s mausoleum site museum’ নামে পরিচিত। মাটির নিচের মূল তিনটি বিশাল গর্ত বা খনন এলাকাকে বড় বড় খিলানযুক্ত ছাদ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যাতে রোদ, বৃষ্টি বা বাইরের ধুলোবালি এই প্রাচীন মূর্তির কোনো ক্ষতি করতে না পারে। জাদুঘরের ভেতরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বাতাসের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে হাজার বছরের পুরনো এই পোড়ামাটির যোদ্ধারা চিরকাল সুরক্ষিত থাকে।

সাধারণ মানুষের দেখার রাজকীয় সুযোগ

পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এই জাদুঘরটি এখন দেশী-বিদেশী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ পর্যটক এই পোড়ামাটির জীবন্ত ইতিহাসের মুখোমুখি হতে চীনের শিআন শহরে ছুটে আসেন। দর্শনার্থীদের সুরক্ষার জন্য মাটির মূল গর্তগুলোর চারপাশে উঁচুতে বিশেষ হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে দাঁড়িয়ে পর্যটকেরা কোনো রকম স্পর্শ ছাড়াই অত্যন্ত কাছ থেকে এই আট হাজার সৈন্যের প্রাচীন রাজকীয় সারি ও যুদ্ধরথ অবলোকন করতে পারেন।

এখনও চলছে রহস্যের নতুন সন্ধান ও গবেষণা

সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো, টেরাকোটা আর্মির এই বিশাল সাম্রাজ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা কিন্তু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আজও চীনা ও আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি বড় দল সেখানে নিয়মিত নতুন নতুন গর্ত খনন ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রতি বছরই মাটির নিচ থেকে নতুন নতুন মূর্তির অংশ ও প্রাচীন অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। তবে বিজ্ঞানীদের আসল রহস্য এখনো সম্রাট কিন শি হুয়াং-এর মূল সমাধিটি ঘিরে, যা এই সৈন্যবাহিনীর কাছেই অবস্থিত হলেও আজ পর্যন্ত তা খনন করা হয়নি। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে, সম্রাটের মূল সমাধির ভেতরে তরল পারদের এক বিশাল নদী তৈরি করা আছে এবং সেখানে বিষাক্ত ফাঁদ থাকার কারণে ও প্রাচীন এই ঐতিহাসিক সম্পদ নষ্ট হওয়ার ভয়ে এখনই মূল সমাধিটি খনন করা হচ্ছে না, যা বিজ্ঞানীদের জন্য আজও এক বিশাল রহস্য।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর