Thursday 09 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাইয়ের দিনলিপি / ফাঁকা রাস্তায় ক্রিকেট উৎসব, ক্ষোভ-উৎসবের নতুন ভাষা

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৯ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৩

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০২৪ সালের ৯ জুলাই, মঙ্গলবার। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রধান প্রধান বিদ্যাপীঠগুলোর আঙিনায় ততই তীব্র হচ্ছিল অধিকার আদায়ের লড়াই। সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন তখন এক মহাসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।

ফাঁকা রাজপথে ক্রিকেট উন্মাদনায় মেধাবীরা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের আহ্বানে এদিন সকাল থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে নেমে আসেন হাজারো শিক্ষার্থী। দুপুরের পর রাজধানীর চেনা ব্যস্ত সড়কগুলো যেন থমকে যায়। শাহবাগসহ বিভিন্ন প্রধান মোড়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে সৃষ্টি হয় এক অন্যরকম দৃশ্যপট। অবরোধের কারণে ফাঁকা হয়ে যাওয়া মূল পিচঢালা রাস্তায় মনের আনন্দে মেতে ওঠেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। কেউ কেউ ব্যাট-বল হাতে মেতে ওঠেন ক্রিকেটের উন্মাদনায়। এই দৃশ্য যেন একই সঙ্গ ক্ষোভ ও উৎসবের এক নতুন ভাষা তৈরি করে।

বিজ্ঞাপন

সারাদেশে প্রতিরোধ

৯ জুলাই দিনটিতে শিক্ষার্থীরা দেশজুড়ে ব্যাপক ‘গণসংযোগ’ কর্মসূচি পালন করেন। তবে গণসংযোগের সমান্তরালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল এবং সড়ক ও রেলপথ অবরোধের মতো তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সর্বত্রই প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে-

বুয়েট: বুয়েটের ১৯ ব্যাচের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমবেত হয়ে এক বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন এবং কোটা সংস্কারের দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দুপুর থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে প্রতীকী অবরোধ গড়ে তোলেন। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে এবং কোটা পদ্ধতি সংশোধনের এক দফা দাবিতে উত্তাল স্লোগান দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও নগর: বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ ছাত্রীরা বিভিন্ন হলে হলে গিয়ে ব্যাপক গণসংযোগ চালান। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দুপুরেই চাটগাঁর ষোলশহর রেলস্টেশনে রেললাইন অবরোধ করেন, যার ফলে কক্সবাজার থেকে ঢাকামুখী দূরপাল্লার ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি সাময়িকভাবে আটকে পড়ে এবং রেল যোগাযোগ অচল হয়ে যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চিরচেনা প্যারিস রোডে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। অন্যদিকে, দুপুর ১২টার দিকে রাজশাহী কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কলেজের প্রধান গেটের সামনের সড়ক অবরুদ্ধ করে কোটাবিরোধী বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: একাডেমিক ভবনের সামনে বিশাল সমাবেশ করার পর বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করে দীর্ঘক্ষণ স্লোগান দিতে থাকেন। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের যান চলাচল থমকে যায়।

হবিগঞ্জ: ঢাকার বাইরের এই মফস্বল শহরেও আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে। হবিগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন।

রাজনীতির মাঠে ইন্ধনের খেলা ও সরকারের হুঙ্কার

৯ জুলাইয়ের এই দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটি মোড়। কারণ, এই দিনেই প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা কোটা আন্দোলনের প্রকাশ্য ও কঠোর বিরোধিতা করে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। তৎকালীন সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক বক্তব্যে বলেন, ‘কোটা ইস্যুতে রাজপথে আন্দোলন করে আইনি বিষয়ের সমস্যা নিরসন সম্ভব নয়।’

একই দিনে দলটির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কোটা আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করে দেশজুড়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক পাহারায় থাকার নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘এ অরাজনৈতিক আন্দোলনে বিএনপি ও তাদের সমমনাদের রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। সেজন্য সারা বাংলাদেশে ও রাজধানীতে সর্বত্র সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে।’

বিএনপির পালটা জবাব: ইন্ধন নয়, মেধার পক্ষে সমর্থন

সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের এই অলস ও রাজনৈতিক অভিযোগের কড়া জবাব দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন যে, ‘মেধার স্বার্থে যদি তারা ঐক্যবদ্ধ হয়, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। ৫০ বছর পরেও যদি সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা বহাল রাখা হয়, তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এর ফলে মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং যোগ্য প্রার্থীরা প্রশাসনে আসতে পারছে না। তাই কোটাবিরোধী ছাত্রদের এই দাবিকে আমরা পূর্ণ সমর্থন করি।’

সংবাদ সম্মেলনে ফের ‘বাংলা ব্লকেড’ ঘোষণা

আন্দোলনের এই ধারাবাহিকতায় এদিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন। সেখান থেকে পরদিন অর্থাৎ ১০ জুলাই বুধবার সারাদেশে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বাত্মক ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের অলস নীতিকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে শিক্ষার্থীরা মাঠে মজা করছে, তবে তারা মস্ত বড় ভুল করছে। ছাত্রসমাজ কাউকে দেখে ভয় পায় না।’

আরেক সমন্বয়ক সারজিস আলম সাফ জানিয়ে দেন, কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংশোধনের এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই লাগাতার আন্দোলন কোনোভাবেই থামবে না।

ইতিহাসের আলোয় ৯ জুলাইয়ের চালচিত্র

পিচঢালা রাজপথে পড়ে থাকা ক্রিকেটের স্টাম্প, স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠা শাহবাগের বাতাস আর হাজারো শিক্ষার্থীর চোখের সেই জ্বলন্ত দীপ্তি যেন এক অদৃশ্য মহাকাব্যের খসড়া লিখছিল। আওয়ামী লীগের ‘ইন্ধনের’ হুঁশিয়ারিকে এক পাশে রেখে ছাত্রসমাজ তখন দেখছিল এক নতুন ভোরের স্বপ্ন। তারা জানত, পরদিন ১০ জুলাইয়ের ‘বাংলা ব্লকেড’ কোনো সাধারণ ধর্মঘট নয়, তা মেধার শৃঙ্খল ভাঙার এক মহালগ্ন। সময়ের স্তব্ধ ক্যানভাসে চব্বিশের এই জুলাই কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর গল্প ছিল না; তা ছিল এক শতাব্দীর ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার প্রথম গর্জন, যার লাভাস্রোত অলক্ষ্যেই বদলে দিতে যাচ্ছিল একটি দেশের মানচিত্র আর কোটি মানুষের নিয়তি।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর