আমাদের চেনা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সাধারণ ও পবিত্র উপায়ে মৃতের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। সাধারণত ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করার সময় মৃতদেহের গায়ে এক টুকরো সাদা কাফন ছাড়া আর কিছুই থাকে না, যা মানুষের জীবনের চরম সত্য ও বৈরাগ্যকে ফুটিয়ে তোলে। তবে পৃথিবীর সব দেশের সংস্কৃতি বা শেষকৃত্যের নিয়ম এক নয় এবং প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মৃতদেহ সমাহিত করার ক্ষেত্রে অদ্ভুত সব রীতিনীতি প্রচলিত রয়েছে। অনেক দেশের সংস্কৃতিতে পরকালের নানা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে মৃত মানুষকে কবর দেওয়ার সময় তার সাথে অত্যন্ত দামি অলংকার, সোনা-দানা ও বিভিন্ন মহামূল্যবান জিনিসপত্র দিয়ে দেওয়ার প্রাচীন রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির এই যুগে মৃতদেহ সৎকারকে কেন্দ্র করে একদমই ভিন্নধর্মী ও চোখ কপালে তোলার মতো এক আজব ঘটনা ঘটছে দূরপ্রাচ্যের উন্নত দেশ জাপানের বেশ কিছু শহরে, যা শুনলে যে কেউ অবাক হতে বাধ্য।
জাপানের বিভিন্ন শহরের শ্মশানে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার পর যে ছাই অবশিষ্ট থাকে, তা থেকে পাওয়া যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ বহুমূল্য ও দামি ধাতু। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিক্কেই এশিয়া’-র একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মানুষের দাঁত থেকে পাওয়া সোনা, রুপা ও প্যালাডিয়াম এবং চিকিৎসাজনিত কারণে মানুষের হাড়ের ভেতরে প্রতিস্থাপিত টাইটানিয়ামের মতো দামি ধাতুগুলো মূলত দাহ করার পর অবশিষ্ট অস্থিভস্ম থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সময় নানা দুর্ঘটনায় মানুষের শরীরের হাড় ভেঙে গেলে বা হাড়ের অসুখজনিত সমস্যার কারণে তা প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে। সেই হাড় জোড়া লাগাতে বা প্রতিস্থাপন করতে চিকিৎসকরা মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত ইস্পাত বা টাইটানিয়াম ব্যবহার করে থাকেন, যা খুব শক্তিশালী, টেকসই এবং মানবশরীরে কোনো বিষক্রিয়া তৈরি করে না। মানুষের মৃত্যুর পরেও এই অত্যন্ত শক্তিশালী ও দামি ধাতুগুলো মানবশরীরে অক্ষত অবস্থায় থেকে যায় এবং দেহ পুড়িয়ে ফেলার পর তা আর গলে বা নষ্ট হয়ে যায় না।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাপানের ৮৮টি প্রধান শহরের মধ্যে ৪২টি শহরের দেহ সৎকারের স্থান বা শ্মশানগুলিতে ২০১০ সালের পর থেকেই এই ধরনের মূল্যবান ধাতু সংগ্রহের কাজকর্ম শুরু হয়। মূলত বৌদ্ধ ধর্মের অনুকরণে জাপানে মৃতদেহ পোড়ানোর রেওয়াজ শুরু হয়েছিল এবং বর্তমানে দেশটির প্রায় সমস্ত মৃতদেহই দাহ করা হয়, যার হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে প্রায় ৯৯ শতাংশ মৃতদেহ শ্মশানে পোড়ানো হয়ে থাকে এবং এখানকার শ্মশান পরিষেবাগুলোর প্রায় ৯৭ শতাংশই সরাসরি সরকার দ্বারা পরিচালিত হয়, যার একমাত্র ব্যতিক্রম হলো রাজধানী টোকিও। জাপানি সামাজিক প্রথা অনুযায়ী শরীর দাহ করার পর পরিবারের সদস্যরা চপস্টিক ব্যবহার করে বড় হাড়ের টুকরোগুলো আলাদা করে একটি বিশেষ পাত্রে জমা করেন এবং এই কাজ শেষ হওয়ার পরেই মূলত অবশিষ্ট অস্থিভস্ম থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে এই মূল্যবান ধাতুগুলো আলাদা করা হয়।
অস্থিভস্ম থেকে নিখুঁতভাবে সংগ্রহ ও বাছাই করা এই মহামূল্যবান ধাতুগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় সরকারিভাবে বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে, তা শুনলে যে কারোরই চোখ কপালে উঠবে। তথ্য বলছে, এই উপায়ে ধাতু বিক্রি করে শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই জাপানি মুদ্রায় প্রায় ৬৯০ কোটি ইয়েন আয় হয়েছে, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় শত শত কোটি টাকার সমতুল্য। জাপানে বর্তমানে মৃত্যুর হার বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ধাতুর দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই খাত থেকে সরকারের আয়ও অনেক বেড়ে গেছে। মৃতদেহ থেকে পাওয়া ধাতু বিক্রি করে আয়ের তালিকায় জাপানের শহরগুলোর মধ্যে ঐতিহাসিক কিয়োটো শহর সবার উপরে অবস্থান করছে এবং এর পরেই রয়েছে ইয়োকোহামা ও নাগোয়া শহর। প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয়েছে যে শ্মশান থেকে পাওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারিভাবে সংগ্রহ করে মূলত জনগণের হিতার্থে এবং শ্মশানের নিজস্ব উন্নয়ন তহবিলে দান করা হয়ে থাকে।
তবে এই প্রবণতা দিন দিন বাড়তে থাকায় দেশটির সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে আইনি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবি তুলেছেন শহরের নাগরিকদের একাংশ। জাপানে বর্তমানে প্রচলিত দাহ করার যে আইনি পরিকাঠামো রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে শেষকৃত্যের পর শুধুমাত্র বড় হাড়ের টুকরোগুলোর ওপর মৃতের পরিবারের আইনি অধিকার থাকে। কিন্তু দেহের অবশিষ্ট ছাই বা ভস্ম, যার ভেতরে মূল্যবান সোনা ও টাইটানিয়ামের মতো ধাতু লুকিয়ে থাকে, তার প্রকৃত আইনি দাবিদার বা মালিক আসলে কে, তা নিয়ে দেশটির সংবিধানে সুস্পষ্ট কোনো আইন বা নিয়ম নেই। ফলে এই পুরো বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় এবং গুগল ট্রেন্ডসের সাম্প্রতিক অনুসন্ধান তালিকায় নেটিজেন ও কৌতূহলী পাঠকদের মাঝে সর্বাধিক পঠিত ও শীর্ষ আলোচিত একটি টপিক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।