ঢাকা: আকাশ ভাঙা বৃষ্টি, নাকি রাজপথ কাঁপানো স্লোগান— কে কাকে ছাপিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের ১২ জুলাইয়ের সেই তপ্ত বিকেলে তা বোঝা যাচ্ছিল না। ঢাকার আকাশ ক্রমেই মেঘে কালো হয়ে আসছিল। তবে হাজারো তরুণের বুকে জমছিল ক্ষোভের বারুদ। আগের দিন ১১ জুলাই ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে সহযোদ্ধাদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ আর টিয়ার শেলের ক্ষত তখনো দগদগে। সেই অন্যায়ের জবাব দিতে ছুটির দিনেও ঘরের চার দেয়াল ভেঙে রাজপথে নেমে এসেছিল এক নতুন প্রজন্ম। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ১ জুলাইয়ের সেই শান্ত নদীটি ঠিক ১২তম দিনে এসে এক প্রলয়ঙ্কারী মোহনায় রূপ নিয়েছিল। এই উত্তাল শুক্রবারের একেকটি মুহূর্ত যেন ছিল এক একটি মহাকাব্য।
বৃষ্টিভেজা মিছিল ও শাহবাগের পতন
বিকেল ৪টার দিকে যখন ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো, অনেকেই ভেবেছিল আজ হয়তো রাজপথ শান্ত থাকবে। কিন্তু প্রকৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে একে একে জড়ো হতে থাকেন শত শত শিক্ষার্থী। বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে লাইব্রেরির সামনে থেকে শুরু হওয়া সেই মিছিল হলপাড়া, উপাচার্য চত্বর আর রাজু ভাস্কর্য পেরিয়ে যখন ঠিক ৫টা ২০ মিনিটে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল, তখন যেন থমকে গেল পুরো ঢাকা শহর। শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ করে যখন হাজার হাজার কণ্ঠ থেকে স্লোগান উঠছিল, ঠিক তখনই সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে আরেক বিশাল মিছিল নিয়ে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। শাহবাগের চারপাশ তখন স্লোগানের চাদরে ঢাকা। পুলিশ শক্ত অবস্থান নিয়ে ব্যারিকেড দিলেও তরুণদের সেই ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞার সামনে তারা ছিল কেবলই নীরব দর্শক।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ
শাহবাগের সেই উত্তাপ কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। ঢাকার বুকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যখন কলাভবন থেকে মিছিল নিয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক কাঁপাচ্ছিলেন, তখন ঢাকার বাইরেও শুরু হয়ে গিয়েছিল এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্টেশনসংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ অবরোধ করে বসলে পুরো উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ থমকে দাঁড়ায়, যেখানে তাদের কাঁধে কাঁধ মেলান রুয়েট ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশন থেকে বের হওয়া হাজারো মানুষের মিছিলটি চকবাজার, জামালখান হয়ে পুরো বন্দরনগরীকে অচল করে দেয়। রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নোয়াখালীসহ দেশের প্রায় ১৫টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র গণজোয়ার।
আঁধারে জ্বলা মশাল ও দোসরদের দম্ভ
বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন চারপাশটা একটু অন্ধকার হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ আলোকিত হয়ে ওঠে শত শত মশালের অগ্নিশিখায়। আঁধারে জ্বেলে ওঠা সেই মশালগুলো যেন এক নতুন ভোরের বার্তা দিচ্ছিল। কিন্তু ঠিক একই সময়ে ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হিসেবে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের গাড়িচালক বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। শুধু তা-ই নয়, আন্দোলনের এই তীব্রতা দেখে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী-আমলারাও নিজেদের দম্ভ লুকিয়ে রাখতে পারেননি।
তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই আন্দোলনে স্বাধীনতাবিরোধীদের ছায়া দেখতে পান। আর ওবায়দুল কাদের তো বলেই ফেলেন, ‘এই আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অপশক্তি ভর করেছে।’ এমনকি তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানও বড় বড় আইনি ব্যবস্থার হুমকি দেন।
নতুন ভোরের প্রতীক্ষা
শাহবাগ মোড় ছাড়ার ঠিক আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার যখন সারা দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে প্রতিনিধি সম্মেলনের ডাক দিচ্ছিলেন, তখন চারপাশের বাতাসে ভাসছিল এক টানটান উত্তেজনা। শাসকের হুমকি, পুলিশের মামলা কিংবা লাঠিচার্জের ভয়। কোনো কিছুই সেদিন সেই তরুণদের দমাতে পারেনি। ২০২৪ সালের ১২ জুলাইয়ের সেই উত্তাল শুক্রবার কেবল একটি তারিখ ছিল না; এটি ছিল এক নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর। রাতের আঁধারে শাহবাগের রাস্তা ফাঁকা হয়ে গেলেও রাজপথে মিশে থাকা স্লোগানের প্রতিধ্বনিগুলো যেন ফিসফিস করে বলছিল; দম্ভের দিন ফুরিয়ে আসছে, সূর্য ওঠার আর বেশি দেরি নেই।