ঢাকা: বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ আর তারুণ্যের তীব্র চিৎকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জমে ওঠা মানুষের ভিড় যেন উত্তাল এক সমুদ্র। ঘড়ির কাঁটা তখন গোধূলি পেরিয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার নামিয়েছে; কিন্তু সেই অন্ধকারকে ছাপিয়ে জ্বলে উঠছে হাজারো শিক্ষার্থীর চোখের আগুন। জুলাই ১৩, ২০২৪। কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজপথ তখন প্রকম্পিত, আর সেই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা করলেন এক কঠিন লড়াইয়ের বার্তা।
২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ও প্রতিবাদের দৃঢ় কণ্ঠস্বর
রাষ্ট্রের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যখন শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে তাদের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল, তখন শিক্ষার্থীরা সেই ভয়ের দেয়াল চূর্ণ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেদিন স্পষ্ট ভাষায় শুনিয়ে দিলেন সময়ের সীমাবদ্ধতা। পুলিশের উদ্দেশে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের নামে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।’ এ যেন শাসকের প্রতি শাসিতের সরাসরি চ্যালেঞ্জ। এই হুঙ্কারে স্পষ্ট ছিল, ভয়কে জয় করে তারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
৩৮ সদস্যের নতুন সারথি ও গণপদযাত্রার ডাক
আন্দোলনকে সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করতে সেই রাতেই নেওয়া হলো এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে ঘোষণা করা হলো ৩৮ সদস্যের বিশাল এক সমন্বয়ক কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যাচের ২৪ জন সমন্বয়ক এবং ১৪ জন সহ-সমন্বয়ককে নিয়ে গঠিত এই নতুন নেতৃত্ব যেন আন্দোলনের নতুন প্রাণশক্তি হয়ে উঠল। এর পাশাপাশি ঘোষণা করা হলো পরবর্তী দিনের জন্য ‘গণপদযাত্রা’ কর্মসূচি। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং ক্লাস বর্জনের ডাক দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কোনো আপস নয়।
ক্ষমতার দম্ভ ও রাজপথের পালটা জবাব
একদিকে যখন শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে অটল, অন্যদিকে তখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের কণ্ঠে শোনা গেল অন্য সুর। ওবায়দুল কাদের সেদিন আন্দোলনের যৌক্তিকতা অস্বীকার করে একে সংবিধানবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল রাস্তা ছেড়ে দেওয়া কঠিন বার্তা। আবার গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকেও এলো কড়া সতর্কবার্তা। কিন্তু এতকিছুর পরেও দমে যাননি শিক্ষার্থীরা। তখনও শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব পথেই ছিলেন অবিচল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ থেকে শুরু করে রাজবাড়ী স্টেশনে মধুমতী এক্সপ্রেস ট্রেন আটকে দেওয়া, দেশের প্রতিটি প্রান্ত যেন সেদিন এক অখণ্ড প্রতিবাদে পরিণত হয়েছিল।
আরেকটি ভোরের অপেক্ষা
এভাবেই সেদিন রাতের অন্ধকারে মোড়ানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের এক নতুন বাংলাদেশের সূতিকাগার। কেউ জানত না, এই চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম আর গণপদযাত্রার ডাক শেষ পর্যন্ত কোন পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে।