ঢাকা: বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে প্রতিফলিত করতে জাতিসংঘের (ইউএন) মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অতিরিক্ত প্রভাব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এ কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংস্কার প্রয়োজন।
মঙ্গলবার(৭ জুলাই) রাজধানীতে অনলাইনে অনুষ্ঠিত ‘রিথিংকিং ইউএন লিডারশিপ ইন অ্যা ফ্র্যাগমেন্টেড ওয়ার্ল্ড: অ্যা বাংলাদেশ-সেন্টার্ড পার্সপেকটিভ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলা হয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), সাউদার্ন ভয়েস এবং ১ ফর ৮ বিলিয়ন ক্যাম্পেইন যৌথভাবে এ আলোচনা আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) হুমায়ুন কবির বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের পর এখন বিশ্ব সবচেয়ে জটিল সময় পার করছে। যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, ঋণসংকট, মানবিক বিপর্যয় ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মধ্যে নতুন মহাসচিবকে সততা, স্বাধীনতা, পেশাগত দক্ষতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা ও নৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করে, ফলে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সামনে বিকল্প থাকে না। এর পরিবর্তে নিরাপত্তা পরিষদ একাধিক যোগ্য প্রার্থীর সংক্ষিপ্ত তালিকা সাধারণ পরিষদে পাঠাতে পারে। এতে চূড়ান্ত নির্বাচন হবে মেধা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে।
হুমায়ুন কবির বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জাতিসংঘের নেতৃত্বকে বড় ও ছোট, উন্নত ও উন্নয়নশীল—সব দেশের স্বার্থ সমান গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করতে সক্ষম হতে হবে।
আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, এটি শুধু একজন মহাসচিব নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভবিষ্যতের প্রশ্ন। কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং দুর্বল জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে সিপিডির গবেষণা সহযোগী আফরিন মাহবুব বলেন, বর্তমান মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়া এখনো নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রার্থীদের নাম ও ভিশন বিবৃতি প্রকাশ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা সীমিত। তিনি উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি এবং সংস্থার বিভিন্ন স্তরেও নারীদের প্রতিনিধিত্ব সন্তোষজনক নয়।
তিনি বলেন, কেবল প্রতীকী প্রতিনিধিত্ব যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
১ ফর ৮ বিলিয়ন ক্যাম্পেইনের উপদেষ্টা বেন ডোনাল্ডসন বলেন, মহাসচিব মনোনয়নের সময় শেষের দিকে এলেও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের প্রভাবের কারণে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের নিয়োগে পর্দার আড়ালের সমঝোতা পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকে দুর্বল করে।
আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মহসীন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার লিমা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম এবং নিজেরা করির সমন্বয়কারী ও সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য খুশী কবির।
মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নতুন মহাসচিবকে এমন নেতৃত্ব দিতে হবে, যা একদিকে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে কাজ করতে পারবে, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণসংকট, বৈষম্য ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো সংকটে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থও সমানভাবে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ভূমিকা জোরদার এবং এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান বক্তারা।
সমাপনী বক্তব্যে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ভবিষ্যতের জাতিসংঘ নেতৃত্বের জন্য শুধু কূটনৈতিক দক্ষতা নয়, নৈতিক কর্তৃত্ব, স্বাধীনতা এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকরভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও অপরিহার্য।
আলোচনার শেষে বক্তারা একবিংশ শতাব্দীর জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচন প্রক্রিয়া গড়ে তোলার আহ্বান জানান।