Sunday 12 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নেই সংস্কার, বন্ধ ড্রেন / অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণেই বৃষ্টিতে ডুবল রাজধানী

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১২ জুলাই ২০২৬ ২২:৫২

বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অফিসগামী লোকজন পড়েন বিপাকে। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: মাত্র একদিনের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে ঢাকা। আবহাওয়া অধিদফতর বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০০৯ সালের পর একদিনে সর্বোচ্চ। এই বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও ঘরে পানি ঢুকে চৌকি ও খাটের ওপর পর্যন্ত তলিয়ে গেছে। সড়কে পানি, ঘরে পানি, অলি-গলিতে পানি, দোকানে পানি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি- সব জায়গায় পানি আর পানি।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র গতকাল রাত ১২টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া দিনভর বৃষ্টি তো চলছেই। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে ঢাকা। ফলে মানুষজন খুব একটা ঘর থেকে বের হতে পারেনি। অফিসগামী লোকজন পড়েছে বিপাকে। ভেজা কাপড়-চোপড় নিয়েই অনেকে কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছেন। বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে রিকশাসহ সব যানবাহনে। এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষজন কোনোভাবেই আজ কাজ করতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীবাসীরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে যখন-তখন ড্রেন নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি, দীর্ঘদিন ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার না করা এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত পথ না থাকার কারণেই আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আবার সাধারণ মানুষের যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, বোতল-প্লাস্টিক ছুড়ে মারা এবং অধিকহারে প্লাস্টিক ব্যবহারের পর তা যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়াও কাল হয়েছে। যতটুকু ড্রেনেজ ব্যবস্থা রয়েছে ততটুকুও ঠিকভাবে পানি নিষ্কাশনে কাজ করছে না। কারণ, প্রায় সবই ড্রেনই ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর, বনানী, বাড্ডা, ভাটারা, বসুন্ধরা, মিরপুর-৭, রুপনগর, মিরপুর-১০ নম্বর, পর্বতা এলাকা, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ইব্রাহীমপুর, কচুখেত, ফার্মগেট, রাজাবাজার, পান্থপথ, গ্রিনরোড, এ্যালিফান্ট রোড, সেগুন বাগিচা, শান্তিনগর, মালিবাগ, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, রাজারবাগ, মতিঝিল, গোপীবাগ, ফকিরাপুল, নয়া পল্টন, পুরানা পল্টন, গুলিস্তান, সিদ্দিক বাজার, বংশাল, নয়াটোলা, আজিমপুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও ডেমরা এলাকার বেশিরভাগ অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে।

এর মধ্যে ফার্মগেট, নিউ মার্কেট, শেওড়াপাড়া, শান্তিনগর, নয়াপল্টন, পুরানা পল্টন, বনানী, মহাখালী ও নাখালপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি পানি জমেছে। এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি জমেছে। ফলে কেউ বাসা থেকে বের হতে পারছে না। অনেকে কাজের কারণে বের হলেও পড়েছেন বিপাকে। কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়াতেও মেলেনি যানবাহন। এসব এলাকা দিয়ে অটোরিকশা চলতে পারেনি। সিএনজি ও প্রাইভেটকার পানিতে ডুবে বিকল হয়ে যায় বলে সেগুলোও রাস্তায় নামেনি। অনেক এলাকায় মূল সড়কে বাস থাকলেও চাহিদার তুলনায় ছিল কম। আবার যে যানবাহনগুলো চলেছে সেগুলোর জন্যও গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। ফলে রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। ছবি: সারাবাংলা

বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। ছবি: সারাবাংলা

পানিতে তলিয়ে যাওয়া এসব এলাকায় ফুটপাত ও মার্কেটে নিম্ন আয়ের লোকজন যে কর্ম করতেন তা আজ বন্ধ রয়েছে। ফলে তারাও চিন্তায় রয়েছেন। আবার এসব এলাকার নিচতলার বেশির ভাগ ঘরই পানিতে ডুবে গেছে। একদিকে পানিতে দুর্গন্ধ, অন্যদিকে আসবাবপত্র ভিজে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, পানি বের হওয়ার রাস্তা না থাকায় এরকম অবস্থা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে কেউ কাজ করছে না। গত দুই-আড়াই বছরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ে তেমন কোনো কাজও হয়নি। ফলে ঢাকাবাসীর কপালে আজকের এই দুর্ভোগ দেখা দিল।

দুর্ভোগে পড়া এলাকাবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশন কোনো কাজ করছে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আর প্রশাসক এক নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আওতায় শত শত কাউন্সিলর কাজ করেন। কিন্তু, প্রশাসকের হয়ে কেউ নেই। তাই এলাকাভিত্তিক সমস্যা সমাধানে কেউ কাজ করছে না। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা, তার ওপর এই জলাবদ্ধতায় মানুষ কীভাবে বাস করবে তা কেউ বুঝতে পারছেন না। অতীতে এরকম পানি কখনই কেউ দেখেনি বলে মন্তব্য ভুক্তভোগীদের।

ফার্মগেট ও আশপাশের এলাকায় আজ সকাল থেকে কোমর সমান পানি। দেখে যে কেউ বলে উঠবে কক্সবাজার এলাম কিনা। তবুও কাজে বের হতে হয়েছে অনেককে। পরনের কাপড় ভিজে একাকার আসাদুজ্জামান নামের এক পথচারীর। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘দেখেন কী অবস্থা। বিশ্বাসই হচ্ছে না যে আমরা ঢাকা শহরে বাস করি।’ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এই শহরটাকে আপনি কোন দিক দিয়ে বসবাসের যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করবেন? সিটি করপোরেশনের কেউ কি সড়কে কাজ করছে? দুর্ভোগে পড়া মানুষজনের সহায়তায় কি সিটি করপোরেশন বা ফায়ার সার্ভিসের কাউকে দেখেছেন? তারা কি পারে না রাস্তায় নেমে পানি নিষ্কাশনে সহায়তা করতে?’

জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সড়কে আটকে থাকা অটোরিকশা ও সিএনজি চালকরা বলেন, পানি ডুবে সিএনজি নষ্ট হয়ে গেছে। ভাড়া ধরব কীভাবে। আর অটোরিকশার মোটর কিছুটা নিচে থাকায় তা হাঁটু সমান পানি না হতেই ডুবে বিকল হয়ে যাচ্ছে। ফলে রিকশার সংখ্যাও রাস্তায় কম দেখা গেছে।’

বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অফিসগামী লোকজন পড়েন বিপাকে। ছবি: সারাবাংলা

বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় অফিসগামী লোকজন পড়েন বিপাকে। ছবি: সারাবাংলা

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া শাখার কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘সড়ক থেকে পানি যাতে দ্রুত নিষ্কাশন হয় সেজন্য বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। ড্রেনের মুখগুলো যাতে ময়লা-আবর্জনা দিয়ে আটকে না থাকে সেজন্য কাজ চলমান রয়েছে।’

অন্যদিকে দুই সিটি করপোরেশনের টিমও কাজ করছে বলে জানা গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমেছে। একদিনে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় এরকম হয়েছে। যেখানে সমস্যা হচ্ছে, সেখানেই সিটি করপোরেশনের লোকজন কাজ করছে।’

অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে মিল্টন বলেন, ‘সকালের দিকে অনেক এলাকায় পানি জমেছিল। বিকেলে সেই পানি অনেকটাই নেমে গেছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনে কাজ করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না, সেসব এলাকাতেও কাজ করছে করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।’ আগামীকাল কোথাও পানি থাকবে না বলেও আশা করেন তিনি।

সারাবাংলা/ইউজে/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর