Monday 06 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সুখরঞ্জনের অপহরণকারী / জামায়াত-বিএনপি-এনসিপির শেল্টার চেয়েছিলেন এএসপি ফজলুর

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৬ জুলাই ২০২৬ ১৯:২০ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২৬ ২২:২৩

রাজনৈতিক দলগুলোর শেল্টার চেয়েছিলেন সুখরঞ্জনের অপহরণকারী এএসপি ফজলুর রহমান। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে এসে নিখোঁজ হন সুখরঞ্জন বালী। জানা গেছে, তাকে গুম করা হয়েছিল। আর এ ঘটনায় ফজলুর রহমান নামে এক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ২ জুলাই রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করে।

রোববার (৫ জুলাই) বিকেলে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রিকিউজিশনের ভিত্তিতে আমরা শুধু আসামি ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে এনেছি এবং হস্তান্তর করেছি। এরপর যা কিছু হবে তার সবই ট্রাইব্যুনাল থেকে করা হবে। অর্থাৎ, আমাদের হাতে কিছু নেই।’

বিজ্ঞাপন

ডিবির ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ফজলুর রহমান গত ৬ ফেব্রুয়ারি অবসর গ্রহণ করেন। এর পর তিনি বাড্ডার নিজ বাসায় ছিলেন। এর আগে তিনি সিআইডিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি ডিপার্টমেন্টাল পদোন্নতি পেয়ে এএসপি হয়েছিলেন।’

সিআইডির ঊর্ধ্বতন আরেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একইদিন দুপুরে সারাবাংলাকে বলেন, ‘এএসপি ফজলুর রহমান ৫ আগস্টের পর প্রথমে পুলিশ সদর দফতরে, এর পর ডিএমপি সদর দফতরে এবং সবশেষ সিআইডিতে ছিলেন। তবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন না। একরকম ওএসডি টাইপের হয়ে চাকরিতে বহাল ছিলেন।’

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে অভ্যুত্থানের পরে ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী। এর পর থেকেই ফজলুর রহমান বিমর্ষ অবস্থায় থাকতেন। কিন্তু প্রতিদিন তাকে কর্মস্থলে হাজিরা দিতে হতো। এ কারণে তাকে প্রতিদিন আসতে হতো। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা বেশ কয়েকবার তদন্তে আসে। এর পর তাকে নজরদারিতে রাখা হয়। তার চলাচলের ওপর নজরদারি করা হয়।

সিআইডি জানিয়েছে, তদন্ত সংস্থা ঘুরে যাওয়ার পর তার পাসপোর্ট জমা নেওয়া হয়। এর পর তার এনআইডি ব্লক করা হয়েছিল । এক পর্যায়ে ফজলুর রহমান বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তিনি নিজেকে রক্ষার জন্য অনেক তদবির করেছেন।

সিআইডি সূত্র জানায়, ফজলুর রহমান ঢাকা দক্ষিণ জামায়াতের এক নেতাকে ধরেছিলেন। নিজেও জামায়াতের রাজনীতিতে যোগদানের কথা ছিল। তবে বিষয়টি দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জণ বালী হওয়ার কারণে জামায়াতে তাকে শেল্টার দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

সুখরঞ্জন বালীকে অপহরণের বিষয়টি অনেক আলোচিত ঘটনা হওয়ায় ফজলুর রহমান ঢাকা মহানগরের একজন বিএনপি নেতার কাছেও গিয়েছিলেন। পারিবারিক লোকজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত জানিয়ে তিনিও বিএনপি করা এবং মোটা অংকের ডোনেশন দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে ওই বিএনপি নেতা দলের ঊর্ধ্বতন নেতার পরামর্শে ফজলুর রহমানকে শেল্টার দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

সবশেষ ফজলুর রহমান এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতার কাছে ধরনা দেন। কিন্তু কোনোভাবেই এনসিপি তাকে শেল্টার দেয়নি। এনসিপির কেন্দ্রীয় অফিসে যাওয়ার ছবি নাহিদ ইসলামের কাছে চলে যায়। তখন তিনি সরাসরি এ বিষয়টি এড়িয়ে যেতে বলেন বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে। তবে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসআই পদে পুলিশে যোগদান করেন। এর পর তিনি ২০১০ সালে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। তখন তিনি ডিবিতে কর্মরত ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু হলে ফজলুর রহমান জামায়াত নেতাদের ধরে আনতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্বও দেন তিনি। জামায়াত ও শিবির নেতাদের ধরে এনে ডিবিতে নির্যাতন চালাতেন ফজলুর। আবার নির্যাতন না করার প্রুতিশ্রুতি দিয়ে অনেকের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়েছেন।

আরও জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্ন্ত ডিবিতে যে ক’জন পুলিশ সদস্য ক্রসফায়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তার মধ্যে অন্যতম ছিলেন এই ফজলুর। ক্রসফায়ারের টিমটি শুধু ঢাকা সিটি নয়, আশেপাশের জেলাগুলোতেও ক্রসফায়ার দিতে যেতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিবিতে তাদের একক আধিপত্য ছিল। একসময় তাদের আশ্রয়-প্রশয় দিতেন ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কার হাত-পা ভাঙতে হবে, আর কাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে হবে- তার নির্দেশনা পালন করতেন এই ফজলু বাহিনী।

২০২০ সালের পর ক্রসফায়ার দেওয়া বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য অনুতপ্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে দিলেও ফজলুর পদোন্নতি পেয়ে এএসপি হন। এরপর পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দাপটের সঙ্গে চাকরি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে মগবাজার ও কাকরাইল মসজিদের সামনে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে যেসব মামলা হয়েছিল তার বেশিরভাগই তদন্ত করেছেন ফজলুর রহমান। তিনি বিএনপি ও ছাত্রদল নেতাদের ধরে এনে ডিবিতে রেখে মাসের পর মাস নির্যাতন চালাতেন। কাউকে আবার কারাগার থেকে রিমান্ডে এনেও নির্যাতন করেছেন। মোটা অংকের টাকা নিয়ে একটু হালকা করে চার্জশিট দিতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বর্তমানে ফজলুর রহমান ট্রাইব্যুনালের মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থা শিগগিরই চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। তবে তার অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।

পিরোজপুরের বাসিন্দা সুখরঞ্জন বালী ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে আদালত প্রাঙ্গণ থেকেই নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে তার পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তখন থেকেই অভিযোগ করে আসছিল যে, তাকে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ওই মাসেরই ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেন সুখরঞ্জন বালী। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়া এবং পরে তার পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ায় তাকে গুম ও নির্যাতন করা হয়েছিল।

এই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে বিবাদী করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ট্রাইব্যুনালের সাবেক বিচারক বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।

সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগের বিবরণ

অভিযোগে সুখরঞ্জন বালী উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের জুলাই-আগস্টের দিকে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তাকে পিরোজপুরের পাড়েরহাটের একটি স্কুলে ডেকে পাঠান। একাত্তরে তার ভাই বিশাবালীকে হত্যার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুখরঞ্জন জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে হত্যা করেছে। তবে হেলাল উদ্দিন তাকে নির্দেশ দেন, হত্যাকারী হিসেবে অন্যদের পাশাপাশি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নামও বলতে হবে এবং ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে হবে। রাজি না হওয়ায় তাকে মারধর করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃত ঘটনা জানতে চান এবং ট্রাইব্যুনালে এসে সত্য বলার অনুরোধ করেন। এতে সুখরঞ্জন রাজি হয়ে ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে পৌঁছান। কিন্তু ফটক থেকেই পুলিশ তাকে চোখ ও হাত বেঁধে তুলে নিয়ে যায়।

সুখরঞ্জনের দাবি, তাকে একটি জানালাবিহীন অন্ধকার ঘরে দুই মাস আটকে রেখে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে অন্য একটি স্থানে নিয়ে আরও দুই মাস নির্যাতন চালানো হয়। এরপর একদিন চোখ বাঁধা অবস্থায় গাড়িতে করে তাকে সীমান্ত এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে বিজিবির সহায়তায় তাকে ভারতের বৈকারী পাঠানো হয়। পরে বিএসএফ তাকে মারধর করে এবং বশিরহাট নিয়ে যায়। বশিরহাট সাবজেলে ২২ দিন রাখার পর তাকে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি জানতে পেরে মাসুদ সাঈদী তার ছেলেকে ভারতে পাঠান। কারাগারে থাকাকালীন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তার সঙ্গে দেখা করে নির্যাতনের তথ্য নথিভুক্ত করেন। দেশে ফেরার পরও নিরাপত্তার কারণে তিনি পিরোজপুরে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি, আত্মগোপনে অন্য জেলায় অবস্থান করছেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর