Sunday 07 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আলোচিত মামলা / রায়ের পর আপিলে দীর্ঘসূত্রিতা, কার্যকরে নেই উদ্যোগ

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৭ জুন ২০২৬ ২৩:১৮

বাংলাদেশের আলোচিত যত মামলার রায়। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: রাজধানীর পল্লবীর শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় মাত্র ১৯ দিনে দিয়েছেন আদালত। গত ১৯ মে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। সেই সময় থেকে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। অতি দ্রুত রায় ঘোষণা করায় একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থী সন্তুষ্ট হয়েছেন, অন্যদিকে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে রায় ঘোষণাই বড় কথা নয়। এই মামলাটি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট হয়ে দ্রুত কার্কর করাই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ। এখন দেখা যাক রায় কার্করে কতদিন সময় লাগে। কারণ, রামিসা ধর্ষণ-হত্যা মামলার মতো আরও অনেক মামলায় ফাঁসির রায় উচ্চ আদালতে এক যুগ পার হলেও ঝুলে আছে। তাই রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

মাগুরায় আছিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলাটি ঝুলে আছে উচ্চ আদালতে। পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার রায় প্রায় ১৫ বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। বুয়েট শিক্ষার্থী আববার হত্যা মামলার রায় ঝুলে আছে সাত বছর ধরে। নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডার মামলার আসামিরা রয়েছে আরাম-আয়েশে। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে। ঢাকার শান্তিনগরে পুলিশ দম্পতিকে খুনের ঘটনায় ঐশির ফাঁসির রায় এখনো কার্যকর হয়নি। মামলাটি উচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষায়। বরগুনায় স্বামীকে হত্যার ঘটনায় মিন্নির ফাঁসির রায় এখনো কার্যকর হয়নি। সেটিও উচ্চ আদালতে।

এত এত আলোচিত মামলার রায়ের পর তা কার্যকর না হয়ে উচ্চ আদালতে ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে বিচারপ্রার্থীরা দিনের পর দিন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন। বিচারপ্রার্থীদের স্বজনরা বলছেন, জীবদ্দশায় রায় কার্যকর দেখতে পারব কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো- মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। ২০১৭ সালের আগস্টে হাইকোর্ট বিভাগের রায় ঘোষণার পর দীর্ঘ সাত বছরেরও বেশি সময় ধরে আপিল নিষ্পত্তির বিষয়টি ঝুলে আছে। এমনকি এখনো এটি শুনানির জন্য কজলিস্টেও আসেনি।

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাসকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ঘটনার দ্রুত বিচার শেষে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ে আট জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৩ জনকে। ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট হাইকোর্টের রায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় কিছুটা পরিবর্তন করে চূড়ান্ত রায় দেন। এতে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। এলা হলো- রফিকুল ইসলাম শাকিল ও রাজন তালুকদার। আর চার জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরা হলো- মাহফুজুর রহমান নাহিদ, এমদাদুল হক এমদাদ, জি এম রাশেদুজ্জামান শাওন ও মীর মো. নূরুল আলম লিমন। বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাইফুল ইসলাম ও কাইয়ুম মিঞা টিপু খালাস পান।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩ আসামির মধ্যে যারা আপিল করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকে দু’জন গোলাম মোস্তফা ও এ এইচ এম কিবরিয়া খালাস পান। বাকিদের সাজা বহাল থাকে। হাইকোর্টের এই রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষ খালাসপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে এবং আসামিপক্ষ তাদের সাজা মওকুফের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন জানায়। হাইকোর্টের রায়ের পর সাত বছরের বেশি সময় পার হলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার শুনানি শুরু হয়নি।

এই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ২১ আসামির মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। তবে ২০২২ পরবর্তী সময়ে র‍্যাব ও পুলিশ বেশ কয়েকজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে (যেমন. আলাউদ্দিন, মোশাররফ হোসেন, কামরুল হাসান) গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাজন তালুকদারসহ এখনো কয়েকজন আসামি পলাতক রয়েছেন। পরিবারের আক্ষেপ হত্যাকাণ্ডের এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো রায় কার্যকর না হওয়াটা আইনি জটিলতা ছাড়া আর কিছু নয়। বিশ্বজিতের পরিবারের দাবি, আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় এবং সাজা দ্রুত কার্যকর করা হোক।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা হলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশবিরোধী চুক্তির সমালোচনার জেরে তাকে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ২৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন আবরারের বাবা।

ওই মামলায় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট এই রায় বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে কয়েকজন পলাতক রয়েছে এবং আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় কারাগার থেকে পালানোর ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে মামলাটি উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায়। আবরারের ছোটভাই বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজ বলেন, ‘দ্রুত এই রায় কার্কর করা হোক- সেটি প্রত্যাশা করছি আমরা। আমার মা এখনো কাঁদে। ছেলে হত্যার বিচারের রায় কার্যকর বেঁচে থাকতে দেখতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’ শুধু বিশ্বজিৎ ও আববার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড নয়, আরও অনেক মামলায় ফাঁসির রায় কার্যকরের জন্য উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষা করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিকুল ইসলাম সোহেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০ কোটি মানুষের‍দেশে এত এত মামলা নিষ্পত্তি করা মাত্র ১০০ জন বিচারকের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ২০২১ সালের মামলাগুলোর ডেথ রেফারেন্স ২০২৬ সালে এসে লেখা শুরু হয়েছে। তাহলে এসব মামলার শুনানি কবে শুরু হবে। স্পেশাল মামলাগুলোর বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা দরকার। সরকারই সিদ্ধান্ত দেবে স্পেশাল মামলাগুলো কত দ্রুত নিস্পত্তি করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন এত এত মামলার আবেদন উচ্চ আদালতে আসছে, যা কল্পনার বাইরে। আর আসামিপক্ষ যেকোনো উপায়েই হোক, তা বিলম্ব করার প্রক্রিয়া খুঁজে থাকে। কাজেই আপনি যেসব মামলার বিষয়ে বলছেন, সেগুলো নিস্পত্তি করতে হলে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ
৭ জুন ২০২৬ ২৩:৫৫

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর