Saturday 06 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রামিসা হত্যা মামলা: সর্বোচ্চ শাস্তির রায়ের অপেক্ষায় সারাদেশ

তাহমিনা ইসলাম, স্টাফ করেসপন্ডট
৬ জুন ২০২৬ ১১:৩৩ | আপডেট: ৬ জুন ২০২৬ ১৫:৫৫

রামিসা হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন। ইনসেটে শিশু রামিশা।

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামী ৭ জুন (রোববার)। ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ দিন রায়ের জন্য নির্ধারণ করেছেন।

সম্প্রতি দেশের সবচেয়ে আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই মামলার রায়কে ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

রামিসার মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর শুধু রাজধানী নয়, গোটা দেশজুড়েই তীব্র ক্ষোভ, শোক ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, নারী ও শিশু অধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকরা দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। সেই প্রেক্ষাপটে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম তুলনামূলক স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হওয়ায় মামলাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আদালত সূত্রে জানা যায়, ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। পরদিন মামলার ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, আলামত জব্দকারী কর্মকর্তা এবং ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষীরা।

অল্প সময়ের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়াটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, শিশু ও নারী নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা গেলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়ে।

৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানিতে দুই আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে আদালত সূত্র জানিয়েছে, প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

এ ছাড়া তদন্ত পর্যায়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি অপরাধের কথা স্বীকার করেছিলেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, আসামির স্বীকারোক্তি, সাক্ষ্য, আলামত এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মিলিয়ে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

চূড়ান্ত শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুল বলেন, রামিসার ওপর সংঘটিত অপরাধ ছিল অত্যন্ত নৃশংস ও মানবিক মূল্যবোধবিরোধী। এমন অপরাধের কঠোর বিচার না হলে সমাজে ভুল বার্তা যাবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ তাদের মক্কেলদের খালাসের আবেদন জানায়। বিকল্প হিসেবে লঘু শাস্তির বিষয়টিও বিবেচনার অনুরোধ করে তারা।

বিচার চলাকালে আদালত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেন। নির্দেশনায় বলা হয়, পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় আসামিদের কোনো বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচার করা যাবে না। পাশাপাশি আদালতের বাইরে তাদের সঙ্গে অননুমোদিত যোগাযোগও সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের সুরক্ষা এবং মামলার সুষ্ঠু নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতেই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

রায়ের তারিখ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পল্লবীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মামলাটি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আদালত এমন একটি রায় দেবেন যা শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।

পল্লবীর বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুর সঙ্গে যা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা চাই অপরাধীরা এমন শাস্তি পাক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।’

গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘রামিসার কথা ভাবলে এখনও কষ্ট লাগে। আমরা আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চাই। এমন শাস্তি হোক, যাতে আর কোনো পরিবারকে এমন শোক বয়ে বেড়াতে না হয়।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল কাদের বলেন, ‘ঘটনার পর পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন মানুষ শুধু রায়ের অপেক্ষায় আছে। আমরা চাই বিচার এমন হোক, যাতে সমাজে ইতিবাচক বার্তা যায়।’

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তানজিলা রহমানের ভাষ্য, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা সমাজের জন্য বড় হুমকি। দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, মামলাটির তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক দ্রুত সম্পন্ন হওয়া বিচারব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তারা বলছেন, শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে ভুক্তভোগী পরিবার যেমন স্বস্তি পায়, তেমনি অপরাধীদের কাছেও শক্ত বার্তা পৌঁছে যায়। তাদের মতে, শুধু শাস্তি নিশ্চিত করাই নয়; ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এখন ভুক্তভোগী পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের দৃষ্টি আগামী ৭ জুনের রায়ের দিকে। রামিসার পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাশাও একটাই। তাদের আদরের শিশুকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অন্তত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই প্রত্যাশা নিয়েই এখন অপেক্ষা পুরো দেশের।

উল্লেখ্য, গত ১৯ মে পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি ভবনে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পল্লবীর পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা সেদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একপর্যায়ে সে নিখোঁজ হয়ে যায়। খোঁজাখুঁজির সময় তার মা পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানার কক্ষের সামনে রামিসার একটি জুতা দেখতে পান।

দীর্ঘ সময় দরজায় কড়া নাড়ার পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে শয়নকক্ষের মেঝে থেকে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং টয়লেটে একটি বালতি থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করে।

ঘটনার সময় প্রধান অভিযুক্ত রিকশা মেকানিক সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেল রানাকে প্রধান আসামি এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সহ-আসামি করা হয়। তদন্তে সংগৃহীত আলামত, সাক্ষ্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন, ফরেনসিক তথ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

সারাবাংলা/টিএম/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর