ঢাকা: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একতরফাভাবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। এই ঘোষণায় দেশের বিরোধীদলগুলো তা প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়। তারই অংশ হিসেবে ধারাবাহিক আন্দোলন শুরু করে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধীজোট। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি, চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবে তার আগেই পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। ঢাকায় শুরু হয় গণগ্রেফতার। ২৯ ডিসেম্বর খালেদার সমাবেশ ঠেকাতে ২৭ ডিসেম্বর রাতেই বালির ট্রাক বসিয়ে সড়কে বেরিকেড দেওয়া হয়।
২৯ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার নয়া পল্টনের মহাসমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য বের হতে চাইলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাসার গেটেই বাধা দেয়। ওই সময় বাসার পকেট গেটটিতে খালেদা জিয়ার পথরোধ করেছিলেন তৎকালীন ডিএমপির এডিসি শামসুন্নাহার। খালেদা জিয়া পুলিশ সদস্যদের কিছুটা ঠেলে বের হতে চাইলে শামসুন্নাহার অন্যন্য নারী পুলিশদের শাসিয়ে বলেন, ‘এই প্রাচীর তৈরি করো শক্তভাবে। কোনোভাবেই যেন তিনি বের হতে না পারেন।’ এ ছাড়া, শামসুন্নাহার বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি কোনোভাবেই বের হতে পারবেন না। সব পথ বন্ধ। আপনাকে ভেতরেই থাকতে হবে।’
বাসা থেকে বের হতে না পেরে ও পুলিশের এডিসি শামসুন্নাহারের আচরণের জবাব দিতেই বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘আপনি কে? আপনার মুখটা এখন বন্ধ কেন? এই যে মহিলা, বলেন তো আপনি যেন কি বলছিলেন। দেশ কোথায় গোপালি?’ এর পর থেমে থেকে বলেন, ‘গোপালগঞ্জ জেলার নামই বদলে যাবে। গোপালগঞ্জ থাকবে না। আল্লাহর গজব পড়বে আপনারা যা শুরু করে দিয়েছেন। আমাদের যেতে দিন, আমাদের গায়ের ওপরে উঠে পড়বেন না। দূরে থাকেন।’
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আপনারা আপনাদের জায়গায় থাকেন। আপনাদের তো রাস্তায় থাকার কথা। আপনার বাড়ির ভেতরে এসে পড়েছেন কেন? আপনাদের মেয়েরা (নারী পুলিশ) এত কথা বলে কেন? এই মেয়েরা চুপ করো। কয়দিনের চাকরি হয়েছে। কীসের জন্য এত কথা বলো, চুপ থাকো। বেয়াদব কোথাকার।’
সেদিন পুলিশের কারণে বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের বাসা থেকে বের হতে পারেননি। সড়কে বালির ট্রাক আর ভেতরে বিপুল সংখ্যক পুলিশের ব্যারিকেড সেদিনের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি, চলো চলো ঢাকা চলো’ মহাসমাবেশ আর হয়নি। ফলে খালেদা জিয়া এক পর্যায়ে বাসার ভেতরে চলে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে গণঅভ্যূথ্যান হলে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ওই বছরের ৪ অক্টোবর গুলশান থানায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) লতিফ হল শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য শরিফুল ইসলাম শাওন একটি মামলা করেন। ওই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে ১ নম্বর এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া, এ মামলার উল্লেখযোগ্য আসামির মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ও সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম।
মামলার মূল অভিযোগ হলো, ট্রাক রাখা ও অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি ও নাগরিক অধিকার হরণের দায়। গত ৫ জুলাই বাধ্যতামুলক অবসরে যাওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি ড. শামসুন্নাহার এবং তৎকালীন গুলশান থানার ওসি রফিকুল ইসলামের (গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন) নামও ছিল।
এতে উল্লেখ করা হয়, মামলার আসামিরা গোপন বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন, ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর যেকোনোভাবে খালেদা জিয়াকে বাসা থেকে বের হয়ে সমাবেশে অংশ নিতে দেওয়া যাবে না। পূর্ব-পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসামিরা মারণাস্ত্র, লাঠি, বন্দুক, টিয়ারশেলসহ যুদ্ধক্ষেত্রের মতো সজ্জিত হয়ে গুলশান-১ ও ২, বনানী, বারিধারা ডিওএইচএস ও মার্কিন দূতাবাসসহ আশপাশের এলাকায় র্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ ২৮ ডিসেম্বর থেকে অবস্থান নেয়। সঙ্গে অস্ত্রের মহড়া দেয় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। সে সময় আশপাশের বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধর ও গণহারে গ্রেফতার করা হয়।
এদিকে অ্যাডিশনাল ডিআইজি শামসুন্নাহার বাধ্যতামুলক অবসর দেওয়া হলেও মামলায় গ্রেফতার দেখানো হবে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। তবে পুলিশের কেউ কেউ বলছেন, শামসুন্নাহারকেও আইনের আওতায় আনা উচিত। তার নেতৃত্বেই সেদিন খালেদা জিয়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
শামসুন্নাহারের সঙ্গে আরও যারা বাধ্যতামুলক অবসর পেয়েছেন তাদের মধ্যে ১৪ ডিআইজি, ১৮ জন অতিরিক্ত ডিআইজি ও একজন পুলিশ সুপার রয়েছেন। বাধ্যতামুলক অবসর পাওয়া এসব কর্মকর্তাদেরও বেশিরভাগই খালেদা জিয়ার মার্চ ফর ডেমোক্রেসি প্রোগ্রামে যেতে বাধা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া এসব কর্মকর্তা রাতের ভোটের কারিগর হিসেবেও চিহ্নিত বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, আন্দোলন ঠেকানোয় বিশেষ ভুমিকা পালনের কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ ফের সরকার গঠন করলে পুরস্কার হিসেবে শামসুন্নাহারকে পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেয়। এরপর তিনি চাঁদপুর জেলা পুলিশ সুপার (২০১৫-২০১৮) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
শামসুন্নাহার ফরিদপুরের সদর উপজেলার চর মাধবদিয়া ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং সারদা সরকারি সুন্দরী মহিলা কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন । এখান থেকে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএসএস সম্মান ও ১৯৯৮ সালে এমএসএস ডিগ্রি লাভ করেন।
২০তম বিসিএস উত্তীর্ণ হয়ে ২০০১ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে মানিকগঞ্জ জেলায় যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, পুলিশ সদর দফতর, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে চাকরি করেছেন।