ঢাকা: ক্রুড ভোজ্যতেল আমদানি থেকে খুচরা বিক্রয় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে সমৃদ্ধকৃত ভোজ্যতেলের ভিটামিন ‘এ’ অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ভোজ্যতেলের নিরাপদতা নিশ্চিত করতে বাজারজাতকরণের সব পর্যায়ে অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং ব্যবহার নিশ্চিত করার আহবান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সুরক্ষার জন্য স্বচ্ছ প্যাকেজিং পরিহার করে দ্রুত অস্বচ্ছ প্যাকেজিং প্রবর্তন করা প্রয়োজন।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাজধানীর হোটেল হলিডে ইন-এর কনফারেন্স রুমে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উদ্যোগে আয়োজিত “স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ ও মানসম্মত ভোজ্যতেল: বিশেষজ্ঞ সংলাপ” শীর্ষক আলোচনায় এ আহবান জানানো হয়।
লার্জ স্কেল ফুড ফর্টিফিকেশন–বাংলাদেশ কান্ট্রি অ্যাডভোকেসি প্রকল্পের কনসালটেন্ট এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুশতাক হাসান মুহঃ ইফতিখারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ সংলাপে দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, রিফাইনারি প্রতিনিধি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনায় বলা হয়, ভোজ্যতেল অধিকতর স্বচ্ছ করার জন্য ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় পরিশোধন করা হলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ফলে এ ধরনের তেল গ্রহণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার প্রসঙ্গে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মলয় কান্তি মৃধা জানান, তার প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ন্যাশনাল নিউট্রিশনাল সার্ভেইল্যান্স অনুযায়ী দেশব্যাপী পরিচালিত জরিপে বর্তমানে খানা পর্যায়ে ৫১ শতাংশ পরিবার প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল ব্যবহার করে, আর ৪৯ শতাংশ পরিবার খোলা ভোজ্যতেল ব্যবহার করে।
এ প্রসঙ্গে বিএসটিআই-এর প্রতিনিধি জনাব এস. এম. আবু সাঈদ জানান, ভোজ্যতেলের প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ফুড-গ্রেড-সংক্রান্ত সনদ, প্রোডাক্ট সার্টিফিকেশন কমিটি থেকে গ্রহণ করা আবশ্যক। তবে ফুড-গ্রেড প্রতীক ব্যবহার এখনও বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
পথিকৃৎ ফাউন্ডেশনের চেয়ার অধ্যাপক লিয়াকত আলী রোগতত্ত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মানবস্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের তেলের ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব রয়েছে। জীবনাচার, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক অভিযোজন সম্মিলিতভাবে জনস্বাস্থ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ বিষয়ে তিনি জনস্বাস্থ্যভিত্তিক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুলতান আলম বলেন, ডিও ডিলাররা ভোজ্যতেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কেমিক্যালের ড্রাম ব্যবহার করে, যেগুলো শনাক্ত করার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব ড্রামে ভোজ্যতেল সরবরাহ বন্ধ করা গেলে ভোজ্যতেলের গুণগত মান আরও উন্নত হবে। যেকোনো গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা উচিত।
আলোচনা শেষে কয়েকটি সুপারিশ উত্থাপন করা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- রিফাইনারি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় বৃদ্ধি করে শতভাগ অস্বচ্ছ ও ফুড-গ্রেড প্যাকেজিং বিষয়ে মতভেদ হ্রাস করা; খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান এবং হোটেল-রেস্তোরাঁয় খোলা ভোজ্যতেলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা; এ লক্ষ্যে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৮ অনুযায়ী “হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং বাণিজ্যিকভাবে খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকরণের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় নির্দেশাবলী” জারি করা; এবং ক্রুড ভোজ্যতেল আমদানির সময় পোর্ট ক্লিয়ারেন্স পর্যায়ে ভারী ধাতুর পরীক্ষা সম্পন্ন করা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুছুর রহমান (পরিচালক, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ), অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী (বিভাগীয় প্রধান, রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট), মো. কুতুবুল আলম (সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ) এবং মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (জিএম কিউসি, কিউএ অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স, টিকে গ্রুপ)।