Monday 10 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ভারপ্রাপ্তে আর কতদিন! / সিরাজগঞ্জে ১০৫৬ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ আগস্ট ২০২৬ ২২:২৫

সিরাজগঞ্জে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বা চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে বেশিরভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ছবি: সারাবাংলা

সিরাজগঞ্জ: জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১ হাজার ৬৭২টি। কিন্তু এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। ফলে বছরের পর বছর ধরে এসব বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত ও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এতে কোথাও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা, কোথাও শিক্ষক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা, আবার কোথাও পাঠদান কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, জেলার প্রায় ৬৩ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি না হওয়ায় জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট তৈরি হয়েছে। সেজন্য দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।

বিজ্ঞাপন

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে উল্লাপাড়া উপজেলায়। এ উপজেলায় ১৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এর পর কাজিপুর উপজেলায় ১৫৯টি, শাহজাদপুরে ১৫৫টি, সিরাজগঞ্জ সদরে ১৪০টি, রায়গঞ্জে ১১৩টি, বেলকুচিতে ১০৩টি, তাড়াশে ৯৭টি, চৌহালীতে ৯০টি এবং কামারখন্দে ৩১টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই।

জেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল থেকে শুরু করে শহর ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত ও চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ সদরের চর-রায়পুর মোহাম্মাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হৈমবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রতিদিন এসব বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান চলছে। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছেন ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা। জেলার অধিকাংশ বিদ্যালয়ের চিত্র প্রায় একই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষকরা বলছেন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম তদারকির পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন, সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথিপত্র সংরক্ষণ, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রধান শিক্ষককে পালন করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব কার্যক্রমে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

এদিকে কোনো কোনো বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে একজন শিক্ষকের ওপর একাধিক দায়িত্ব এসে পড়ায় নিয়মিত পাঠদান ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ দু’টিই সমন্বয় করতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা ও উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রাকিবুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জেলার বিপুলসংখ্যক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে শুরু করে শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও পাঠদান সব ক্ষেত্রেই নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করা হলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।’

শিক্ষকদের অভিযোগ, শুধু প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকাই নয়, যারা দীর্ঘদিন ধরে চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের কাজ করছেন, তাদেরকেও নানা ধরনের বঞ্চনার মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করলেও এখনো সহকারী শিক্ষকের মূল বেতন কাঠামোতেই রয়েছেন। ফলে দায়িত্বের সঙ্গে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার সমন্বয় হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।

চলতি দায়িত্বে থাকা একাধিক শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিদিন বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজ সামলাতে হয়। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও করতে হয়। সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন, দাফতরিক কাগজপত্র প্রস্তুত, সভা, প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন তথ্য পাঠানোসহ নানা কাজের চাপ থাকে। কিন্তু স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের মতো সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের মধ্যে হতাশাও তৈরি হচ্ছে।

হৈমবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মেরিনা সুলতানা সারাবাংলাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পাঠদানও করতে হয়। এতে দায়িত্বের চাপ বেড়ে যায়। স্থায়ীভাবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি হলে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা আরও সহজ হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ। একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পাঠদানের মান, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে এ পদ শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের পর থেকে নতুন করে প্রধান শিক্ষক পদে বড় ধরনের পদোন্নতি না হওয়ায় শূন্য পদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে। এর মধ্যে অবসর, বদলি, পদোন্নতি ও অন্যান্য কারণে প্রধান শিক্ষক পদ আরও শূন্য হয়েছে। ফলে এক পর্যায়ে জেলার অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

শিক্ষকদের ভাষ্য, একজন সহকারী শিক্ষককে যখন দীর্ঘদিন চলতি দায়িত্বে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তাকে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও করতে হয়। এতে তার নিজের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান, প্রস্তুতি ও শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়ার সময় কমে যায়। আবার কিছু বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে দিয়ে সাময়িকভাবে কাজ চালানো হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিদ্যালয় পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট আরও প্রকট বলে জানান শিক্ষকরা। চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক স্বল্পতার পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক পদও শূন্য রয়েছে। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।

অভিভাবকরাও বলছেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন না, তিনি বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন। তাই দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশে তার প্রভাব পড়তে পারে। দ্রুত শূন্য পদ পূরণ করে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক দেওয়ার দাবি তাদের।

তবে দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাহাব উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক পদে যে শূন্যতা রয়েছে, তা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে পদোন্নতির সফটওয়্যার খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে শূন্য পদগুলো পূরণ হবে। এতে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম আরও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’

প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা জানান, প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তথ্য যাচাই-বাছাইসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। সফটওয়্যারভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে জেলার দীর্ঘদিনের শূন্যতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে শিক্ষকরা বলছেন, শুধু পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করলেই হবে না, দ্রুত তা শেষ করে বাস্তবে বিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক পদায়ন করতে হবে। কারণ বছরের পর বছর ধরে চলতি ও ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকরা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছেন।

তাদের মতে, একটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকলে তিনি দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারেন, শিক্ষকদের মধ্যে কাজের সমন্বয় করতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান উন্নয়নে নিয়মিত তদারকি করতে পারেন। পাশাপাশি অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করাও সহজ হয়। ফলে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকার কারণে যে প্রশাসনিক ও একাডেমিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পূরণ করা জরুরি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক ও কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্বও প্রয়োজন। জেলার ১ হাজার ৫৬টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকার বিষয়টি তাই শুধু জনবল সংকট নয়, এটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা এ সংকট দ্রুত সমাধান করা না হলে এর প্রভাব বিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রমে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, পদোন্নতির সফটওয়্যার খোলার পর দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করে যোগ্য শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এতে একদিকে যেমন চলতি ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ফিরবে গতি। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষা পরিবেশও আরও উন্নত হবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর