দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত। পোশাকশিল্পের হাত ধরে কৃষিনির্ভর একটি দেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান শ্রম ব্যয়, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এই খাতের চাপ বাড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ এমন একটি শিল্পের দিকে নজর দিচ্ছে, যার আকার হয়তো একটি শার্টের বোতামের চেয়েও ছোট; কিন্তু প্রভাব ও গুরুত্ব বহুগুণ বেশি। সেটি হলো- ‘সেমিকন্ডাক্টর’ বা মাইক্রোচিপ উৎপাদন শিল্প।
‘সিলিকন রিভার’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ১০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সময়ের বিচারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিকস, বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), টেলিযোগাযোগ, চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে শুরু করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ আধুনিক প্রায় সব শিল্পেরই মৌলিক ভিত্তি সেমিকন্ডাক্টর।
ভিত্তি ও সম্ভাবনা
মাইক্রোচিপ উৎপাদনে বাংলাদেশের সামনে একটি শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭০০-এর বেশি অভিজ্ঞ চিপ ডিজাইনার রয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় ২০ হাজার কম্পিউটার ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক বের হচ্ছেন।
এই বাস্তবতায় দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘ডিজিটাল টুইন’ বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে দেশের প্রকৌশলীরা ফ্রিল্যান্সিং থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার প্রয়োগ সব ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরতে পারবেন।
শত শত কোটি ডলার ব্যয়ে বড় আকারের ‘ওয়েফার ফেব্রিকেশন প্ল্যান্ট’ বা ‘ফ্যাব’ স্থাপনের আগে বাংলাদেশের উচিত ‘ডিজিটাল টুইন’-এর ওপর গুরুত্ব দেওয়া। কারণ আধুনিক সবধরনের উৎপাদন কারখানার জন্যই ডিজিটাল টুইন প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে এটি এখনো পর্যাপ্তভাবে পড়ানো বা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় না। ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বিকাশে এর দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এভাবে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিপুলসংখ্যক আইটি পেশাজীবীকেও নতুন এই খাতের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল টুইন বিশেষজ্ঞ বা প্রকৌশলীদের আয়ও বেশ আকর্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রে এ পেশায় গড় বার্ষিক আয় প্রায় ১ লাখ ৩৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৮ হাজার ডলার। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের পদে এ আয় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ভারতে এ পেশায় গড় বার্ষিক আয় প্রায় ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ রুপি।
অন্যদিকে একটি ‘ফ্যাব’ স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এর জন্য প্রয়োজন হয় অব্যাহত উচ্চপ্রযুক্তির অবকাঠামো। তাই ফ্যাব নির্মাণের আগে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে তরুণ প্রকৌশলীদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো।
‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহারের গুরুত্ব
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে শিল্পায়নের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) থেকে শুরু করে উৎপাদন-পরবর্তী পর্যায় এবং ভোক্তার অভিজ্ঞতা বোঝা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশকে ডিজিটাল টুইনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ডিজিটাল টুইন হলো কোনো বাস্তব পণ্য, যন্ত্র বা সম্পূর্ণ কারখানার একটি জীবন্ত ও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল প্রতিরূপ। এটি বাস্তব ও ডিজিটাল জগতের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। ফলে কোনো চিপ বা প্রোটোটাইপ বাস্তবে তৈরির আগেই ডিজিটাল মডেলের মাধ্যমে এর সিমুলেশন, পরীক্ষা ও কার্যকারিতা উন্নয়ন করা সম্ভব।
ডিজিটাল টুইন ব্যবহারের সরাসরি সুবিধা
ঝুঁকি ও ব্যয় কমানো: বাস্তবে চিপ তৈরির আগে ডিজিটাল মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা চালানো যায়। এতে প্রোটোটাইপ তৈরির ব্যয় ও ঝুঁকি দুটিই কমে এবং কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
প্রথমবারেই নির্ভুল ফলাফল: চিপের ত্রুটি বা কর্মক্ষমতা আগেই অনুমান করা সম্ভব হওয়ায় বারবার নতুন করে কাজ করার প্রয়োজন কমে যায়।
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি: সিস্টেমের অচলাবস্থা কমানো, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ করা এবং একই নকশা সর্বোচ্চ মাত্রায় পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
ছোট থেকে বড় পরিসরে যাওয়ার সুযোগ: নতুন স্টার্টআপ ও গবেষকেরা ডিজিটাল সিমুলেশনের মাধ্যমে ছোট পরিসরে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে বড় পরিসরে সম্প্রসারণ করতে পারবেন।
করণীয় পরিকল্পনা
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চারটি নির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর কাজ করতে হবে-
১. দক্ষ জনশক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামো
ভিএলএসআই, মাইক্রোইলেকট্রনিকস এবং ইডিএ-সংক্রান্ত কোর্সগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে। শিক্ষার্থী ও স্টার্টআপগুলোর জন্য যৌথ ‘ডিজিটাল টুইন ও ইডিএ সিমুলেশন ল্যাব’ স্থাপন করতে হবে, যাতে তারা ব্যয়বহুল সফটওয়্যার সহজে ব্যবহারের সুযোগ পায়।
২. নীতি ও অবকাঠামোগত নিশ্চয়তা
বাজেটে ঘোষিত কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির ডেটা করিডর, শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং মেধাস্বত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. আঞ্চলিক বাস্তবতা ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র তৈরি
ভারত তার সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি রুপি বিনিয়োগ করছে। তাই ভারতের বা তাইওয়ানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে বাংলাদেশের উচিত চিপ ডিজাইন, ডিজিটাল টুইন সিমুলেশন, ভেরিফিকেশন এবং পরবর্তী ধাপে অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং (এটিপি) খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪. উৎপাদন-পরবর্তী পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও গ্রাহকের মতামত সংগ্রহ
চিপ ডিজাইনে দক্ষতা অর্জনের পর ধীরে ধীরে সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (এটিপি/ওস্যাট) শিল্পে প্রবেশ করতে হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
চিপ বাজারে ছাড়ার পরও কাজ শেষ হবে না। ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও চিপের কর্মক্ষমতা-সংক্রান্ত তথ্য রিয়েল টাইমে সংগ্রহ করতে হবে। পরে এসব তথ্য গবেষণা ও উন্নয়ন এবং পরবর্তী প্রজন্মের চিপ ডিজাইনে ব্যবহার করে সেমিকন্ডাক্টরের মান ক্রমাগত উন্নত করা সম্ভব।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়
সেমিকন্ডাক্টর খাত থেকে ১০০ কোটি ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতারও পরীক্ষা। তৈরি পোশাক খাত সফল হয়েছে, কারণ কয়েক দশক ধরে এর চারপাশে একটি শক্তিশালী শিল্প-পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত দূরদর্শিতা।
‘সিলিকন রিভার’-এর স্বপ্ন অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য। তবে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে ডিজিটাল ক্ষেত্রে প্রথম এই জটিল কাজগুলো বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারে- এটিই আসল চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সারাবাংলা ও সারাবাংলা ডট নেট