Wednesday 20 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

প্রথম রানি এলিজাবেথ ছিলেন ছদ্মবেশী পুরুষ!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২০ মে ২০২৬ ২০:৪৫

বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সফল, প্রখর মেধাবী এবং প্রভাবশালী শাসক হওয়া সত্ত্বেও যার নামটির সঙ্গে আজীবন বিতর্ক জড়িয়ে রয়েছে, তিনি হলেন ইংল্যান্ডের টিউডর বংশের রানি প্রথম এলিজাবেথ। ১৫৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই রানি দীর্ঘ ৪৫ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে রাজ্য শাসন করেছিলেন। তবে তাকে নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হলো; তিনি কি আসলেই একজন নারী ছিলেন, নাকি পুরুষ? কেন তিনি আজীবন কুমারী রয়ে গেলেন?

আধুনিক ইতিহাসবিদ, চিকিৎসক এবং সমকালীন নথির আলোকে এই কুমারী রানির জীবনের রোমাঞ্চকর রহস্যের ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

কেন বিয়ে করেননি এলিজাবেথ?

১৫৫৮ সালে সিংহাসনে বসার পর প্রথম এলিজাবেথ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনি কখনো বিয়ে করবেন না। প্রচলিত ধারণা বলে, শৈশবের ট্রমা ও চারপাশের রাজনৈতিক বিপর্যয় তাকে বিয়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। এলিজাবেথের বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তার বাবা রাজা হেনরি অষ্টম তার মা অ্যান বোলেনকে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দেন। বাবার এই নিষ্ঠুরতা এবং একের পর এক সৎ মায়ের আগমন তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। তার সৎ বোন ম্যারি টিউডর স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপকে বিয়ে করে এক চরম রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। এলিজাবেথ বুঝতে পেরেছিলেন, তৎকালীন ইউরোপে বিয়ে করার অর্থই হলো নিজের ক্ষমতা কোনো পুরুষের হাতে সমর্পণ করা। তিনি ক্ষমতার ভাগীদার চাননি, তাই নিজেকে ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ’ বলে ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

তবে এই সিদ্ধান্তের কারণেই ডালপালা মেলে এক অদ্ভুত মিথ ‘দ্য বিসলে বয়’ (The Bisley Boy)।

‘বিসলে বয়’ মিথ?

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিখ্যাত ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসের লেখক ব্রাম স্টোকার এবং পরবর্তীতে মার্কিন থ্রিলার লেখক স্টিভ বেরি তাদের লেখায় দাবি করেন, যে রানি প্রথম এলিজাবেথ ইংল্যান্ড শাসন করেছিলেন, তিনি আসলে একজন পুরুষ ছিলেন। এই দাবির পেছনে রয়েছে এক চমকপ্রদ গল্প…

১৫৪৩ সালের দিকে যখন ইংল্যান্ডে প্লেগ মহামারি আকার ধারণ করে, তখন ১০ বছর বয়সী রাজকন্যা এলিজাবেথকে বাঁচানোর জন্য লন্ডনের বাইরে ‘বিসলে’ (Bisley) নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে পাঠানো হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখানে রাজকন্যা প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রাজার ভয়ে আতঙ্কিত সেবিকারা আসল সত্য লুকিয়ে ফেলেন। তারা রাজকন্যার অবিকল দেখতে লালচে চুলের কোনো মেয়ে খোঁজার চেষ্টা করেন, কিন্তু পুরো গ্রামে কোনো মেয়ে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত একটি মিষ্টি চেহারার এতিম ছেলেকে রাজকন্যার পোশাক ও পরচুলা পরিয়ে রাজার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। রাজা হেনরি দীর্ঘদিন পর মেয়েকে দেখায় এবং খুব কম যাতায়াত থাকায় সেই পরিবর্তন ধরতে পারেননি।

এই মিথ জোরালো হওয়ার পেছনে কিছু অদ্ভুত যুক্তি

রানির কক্ষে নির্দিষ্ট কয়েকজন বিশ্বস্ত দাসী ছাড়া কারও প্রবেশাধিকার ছিল না। তিনি চিকিৎসকদেরও শরীর সম্পূর্ণ পরীক্ষা করতে দিতেন না। এমনকি মৃত্যুর পর তার ময়নাতদন্ত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।লন্ডনে ফেরার পর তার গৃহশিক্ষক তার হঠাৎ পুরুষালি আচরণ এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার শারীরিক গঠন কিছুটা পুরুষালি রূপ নেয় এবং তিনি সবসময় ভারী মেকআপ ও পরচুলা ব্যবহার করতেন। ১৮০০ শতকের দিকে বিসলে গ্রামে একটি প্রাচীন কফিন পাওয়া যায়, যার ভেতরে একটি রাজকীয় পাথর খচিত পোশাক পরিহিত লালচে চুলের বালিকার কঙ্কাল ছিল। ধারণা করা হয়, এটিই ছিল আসল এলিজাবেথের দেহ।

ইতিহাসবিদদের কাউন্টার লজিক: কেন এই মিথ ভিত্তিহীন?

আধুনিক ইতিহাসবিদরা এই ‘পুরুষ’ হওয়ার তত্ত্বকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের যুক্তিগুলো অত্যন্ত জোরালো! রাজা হেনরি অষ্টম তার সন্তানদের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। নিজের মেয়েকে তিনি চিনতে পারবেন না, এটা অসম্ভব। রানির ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের গোপন নথিতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, রানির অন্যান্য নারীদের মতোই নিয়মিত ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড হতো। এমনকি একসময় তার সন্তান ধারণের ক্ষমতা নিয়েও চিকিৎসকরা পরীক্ষা করেছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীতে একজন নারী সফলভাবে রাজ্য শাসন করছেন, এটি তৎকালীন অনেক পুরুষ মেনে নিতে পারেননি। তাই রানির রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে খাটো করতে এবং স্পেনের সম্রাটকে বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নিতে এই ধরণের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল।

রূপচর্চা নাকি মৃত্যুর ফাঁদ?

রানি এলিজাবেথ ফ্যাশন সচেতন ছিলেন এবং জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পছন্দ করতেন। কিন্তু তার এই রূপচর্চায় লুকিয়ে ছিল এক মারাত্মক মরণফাঁদ।

তিনি তার চেহারাকে অতিরিক্ত ফ্যাকাশে ও সাদা দেখানোর জন্য ‘ভেনেশিয়ান সিরুস’ (Venetian Ceruse) নামক একটি প্রসাধন ব্যবহার করতেন। এটি ছিল মূলত সাদা সিসা (White Lead) এবং ভিনেগারের মিশ্রণ। রানি নিজের মুখে জোঁক লাগিয়ে রাখতেন, যাতে জোঁক রক্ত চুষে নেয় এবং রক্তশূন্যতার কারণে মুখ ফ্যাকাশে দেখায়। এছাড়া বছরের পর বছর সিসা বা লেডযুক্ত মেকআপ ব্যবহারের ফলে তা ত্বকের মাধ্যমে তার রক্তে মিশে যায়। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্রনিক লেড পয়জনিং’ (Chronic Lead Poisoning) বলা হয়।

১৬০৩ সালের ২৪ মার্চ যখন তিনি মারা যান, তখন তার চুল পড়ে গিয়েছিল, ত্বক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং তিনি স্মৃতিভ্রমসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ঐতিহাসিক এবং চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিখুঁত সুন্দর দেখানোর এই মারাত্মক মেকআপের বিষাক্ত উপাদানই ধীরে ধীরে রানিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

পরিশেষ

রানি প্রথম এলিজাবেথ নারী ছিলেন নাকি পুরুষ; এই রহস্যের শতভাগ বৈজ্ঞানিক সমাধান হয়তো কখনোই সম্ভব নয়, কারণ তার ডিএনএ পরীক্ষার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। তবে ছদ্মবেশের গল্পটি যতই মুখরোচক হোক না কেন, ইতিহাস তাকে একজন অদম্য, বুদ্ধিমতী এবং সফল নারী শাসক হিসেবেই মনে রাখবে, যিনি পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একক শক্তিতে একটি সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।

(তথ্যসূত্র: অল দ্যাট ইন্টারেস্টিং, হিস্টোরি মিস্টেরিয়াস এবং সমকালীন ব্রিটিশ রাজকীয় আর্কাইভ)

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর