কবিও তার কবিতায় মৌমাছিকে রেখেছেন একটি কর্মচাঞ্চচল্যের উদাহরণ হিসেবে। পৃথিবীর প্রকৃতিতে যেই পতঙ্গটি বেশ গুরুত্ব বহণ করে। রঙিন ফুলের পাপড়িতে ডানা ঝাপটে গুণগুঞ্জন সুরে উড়ে চলা ছোট্ট পতঙ্গটি কেবল মধুর উৎস নয়, বরং আমাদের এই চেনা পৃথিবীর অস্তিত্বের এক অতন্দ্র প্রহরী। প্রতি বছর ২০ মে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় বিশ্ব মৌমাছি দিবস। মানুষের সাথে মৌমাছির এই সম্পর্ক আজ বা কালকের নয়, বরং হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতা ও কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে এই অকুতোভয় ডানাওয়ালা দল।
ইতিহাসের পাতা থেকে আধুনিক মৌমাছি পালন
বিশ্ব মৌমাছি দিবস উদযাপনের পেছনের ইতিহাসটি বেশ চমৎকার। যার সাথে জড়িয়ে আছে আধুনিক মৌমাছি পালনের জনক অ্যান্টন জানসার নাম। ১৭৩৪ সালের ২০ মে স্লোভেনিয়ায় একটি ঐতিহ্যবাহী মৌচাষি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই গুণী মানুষটি। তিনি চিত্রশিল্পের চমৎকার ক্যারিয়ার ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে মৌমাছি পালনে নিজেকে নিয়োজিত করেন। এবং আধুনিক চাকার মতো তৈরি মৌচাক নকশা ও পরিযায়ী মৌচাষের ধারণা প্রবর্তন করে এই খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তার এই অনন্য অবদান ও জন্মক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে স্লোভেনিয়া সরকারের বিশেষ প্রস্তাবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ ২০ মে তারিখটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মৌমাছি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবং ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এটি নিয়মিত পালিত হয়ে আসছে। মে মাসটিকে বেছে নেওয়ার আরেকটি প্রাকৃতিক কারণ হলো, উত্তর গোলার্ধে এ সময় মৌমাছিদের পরাগায়নের ব্যস্ততা থাকে সবচেয়ে বেশি আর দক্ষিণ গোলার্ধে শুরু হয় মধু ও মৌ-সামগ্রী আহরণের ধুম।
প্রতি তিন লোকমা খাবারের এক লোকমার নেপথ্যের কারিগর মৌমাছি
আমরা প্রতিদিন টেবিলে যে বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার উপভোগ করি, তার একটি বিশাল অংশ সরাসরি নির্ভর করে মৌমাছির অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর। বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত প্রধান প্রধান খাদ্যশস্য ও ফলের প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং বন্য ফুল ও উদ্ভিদের প্রায় ৯০ শতাংশেরই পরাগায়ন ঘটে মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগায়নকারী পতঙ্গের মাধ্যমে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের প্রতি তিন লোকমা খাবারের অন্তত এক লোকমা আসে সরাসরি মৌমাছির পরাগায়নের সুবাদে। তরমুজ, মিষ্টি কুমড়া, সূর্যমুখী, সরিষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাইট্রাস জাতীয় ফলের উৎপাদন ও মান বাড়াতে মৌমাছির বিকল্প নেই। এমনকি গবাদি পশুর প্রধান খাদ্য আলফালফা বা লুসার্ন ঘাসের বীজ উৎপাদনের জন্যও এই পতঙ্গের উপস্থিতি অপরিহার্য। ফলে মৌমাছি যদি হারিয়ে যায়, তবে বিশ্বজুড়ে খাদ্য শৃঙ্খলে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অধিকারকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
প্রকৃতির এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি
মৌমাছি শুধু পরিবেশেরই ভারসাম্য রক্ষা করে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এক স্বনির্ভর ও উৎপাদনমুখী মডেল তৈরি করতে পারে। এক কেজি মধু তৈরি করতে একঝাঁক মৌমাছিকে প্রায় ৪০ লাখ ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করতে হয় এবং পুরো জীবনকালে একটি গড়পড়তা কর্মঠ মৌমাছি মাত্র এক চা চামচের বারো ভাগের এক ভাগ মধু তৈরি করতে পারে। এই বিপুল শ্রমের ফসল হিসেবে আমরা যে কেবল সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন মধু পাই তা নয়। এর পাশাপাশি মোম, প্রোপোলিস ও রয়্যাল জেলির মতো মূল্যবান উপাদান পাওয়া যায় যা ওষুধ, প্রসাধন ও পুষ্টিকর খাদ্য শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক মৌচাষের মাধ্যমে গ্রামীণ তরুণ ও নারীদের জন্য স্বল্প পুঁজিতে স্বাধীন উদ্যোক্তা হওয়ার এক বিশাল দুয়ার উন্মোচন করা সম্ভব, যা সামগ্রিক কৃষি অর্থনীতির বিকাশ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় বৈষম্য হ্রাসে সরাসরি অবদান রাখে।
জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বিপন্ন মৌমাছি
আজকের এই আধুনিক ও শিল্পায়িত বিশ্বে মৌমাছিরা সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের তৈরি দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনের পর বন ধ্বংস, ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মৌমাছির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিগত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ মৌমাছি ও বোলতার প্রজাতি হারিয়ে গেছে এবং ইউরোপের বন্য মৌমাছির প্রতি ১০টি প্রজাতির মধ্যে ১টি প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ফুল ফোটার চিরাচরিত সময় বদলে যাচ্ছে, যার ফলে মৌমাছিরা সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত খাদ্য খুঁজে পাচ্ছে না। কীটনাশকের বিষাক্ত ছোবল তাদের স্নায়ুতন্ত্রকে দুর্বল করে দিচ্ছে, যার ফলে তারা নিজেদের চাকে ফেরার পথ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতির এই নীরব স্থপতিদের হারিয়ে যাওয়া মানে পরিবেশের এক বিশাল কার্বন শোষক এবং সবুজ সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়া।
সুরক্ষার অঙ্গীকার হোক আগামী দিনের পাথেয়
বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই পৃথিবী গড়তে মৌমাছিদের জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। কৃষি জমিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করা এবং ডালপালা ও বুনো ফুলে ভরা প্রাকৃতিক উপত্যকাগুলোকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরাও আমাদের বাড়ির ছাদ, বারান্দা বা বাগানে মৌমাছি-বান্ধব ফুল ও গাছ রোপণ করে তাদের চমৎকার অভয়াশ্রম তৈরি করে দিতে পারি। একই সাথে স্থানীয় মৌচাষিদের কাছ থেকে খাঁটি মধু ও মৌ-সামগ্রী ক্রয়ের মাধ্যমে এই পরিবেশ-বান্ধব পেশাকে উৎসাহিত করা সম্ভব। বৈষম্যমুক্ত, সবুজ ও একটি নিরাপদ সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের এই যাত্রাপথে প্রকৃতির এই ক্ষুদ্রতম বন্ধুদের সুরক্ষা দেওয়া আমাদের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, কারণ মৌমাছিরা টিকে থাকলেই কেবল টিকে থাকবে আমাদের এই সবুজ পৃথিবী ও আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
আবারো কর্মচঞ্চল হয়ে উঠুক মৌ-পতঙ্গ
‘ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে,
দাঁড়াবার সময় যে নাই।’
কবির লেখা এই কবিতার মতনই ব্যস্ত থাকুক আমাদের প্রকৃতি সেবক এই মৌমাছি দল। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব থেকে মুক্তি পাক এই পতঙ্গরা। আজন্ম থেকে ভবিষ্যত- টিকিয়ে রাখুক আমাদের কৃষি, অর্থনীতি, খাদ্য ও প্রকৃতিকে। বিশ্ব মৌমাছি দিবসে- এটাই হোক সকলে প্রত্যয়।