Monday 24 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আট মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬২ হাজার: সিপিডি

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৪ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৩৭

– ছবি : সংগৃহীত

ঢাকা: দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর পর্যালোচনায়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক।

একই সময়ে শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে শূন্যে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমেছে। বিনিয়োগ, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ও বিদেশি বিনিয়োগে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব। গ্যাস–সংকটও শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সোমবার(২৪ আগস্ট) ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

সিপিডি বলছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এ লক্ষ্য অর্জন করতে রাজস্বে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন। সিপিডির হিসাবে, অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের প্রায় ১৯ থেকে ২০ শতাংশ ঘাটতি হতে পারে। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি আরও কমে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। সরকারের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। মোট সরকারি ঋণের মধ্যে ব্যাংক থেকে নেওয়ার অংশ ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে।

শিল্প খাতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়া। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।  বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা ও শিল্পে বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে তা ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

সিপিডির মতে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা এবং কার্গো গ্রহণে সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে গ্যাসনির্ভর শিল্পে। টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিক শিল্প উৎপাদনে সমস্যায় পড়েছে। শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি বলে মনে করছে সিপিডি। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির হার সামান্য বেড়েছে। ৮ দশমিক ১ শতাংশ থেকে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। রফতানি খাতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রফতানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে একই সময়ে আমদানি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসাবেও অবনতি হয়েছে। আগে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত থাকলেও তা এখন ৬০০ মিলিয়ন ডলারের ঘাটতিতে চলে গেছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও কমেছে। ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে তা ১১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে বিদেশে মাসিক গড় কর্মসংস্থান ৯৫ হাজার ৫২১ জন থেকে কমে ৫১ হাজার ২৩৫ জন হয়েছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের দুটি বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও সেখানে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। একই সময়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনুকূলে ছিল না। ফলে অর্থনীতির উত্তরণের ধারা দুর্বল অবস্থায় ছিল।
তবে সরকারের বড় দুর্বলতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না করার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার বারবার বলছে, তারা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু কী পরিস্থিতি থেকে দায়িত্ব নেওয়া হয়েছিল, তার একটি সমন্বিত দলিল না থাকায় এখন সরকারের বিভিন্ন বক্তব্যের সঙ্গে পরিসংখ্যানের সমন্বয় করা কঠিন হচ্ছে।

সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছে সিপিডি। নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা করেছে। এগুলোকে নয়টি ভাগে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি এমপিদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে সিপিডি।

তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন ড. দেবপ্রিয়। তার মতে, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতিরও কিছু ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে।

আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু আইনে ত্রুটি ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও মব সহিংসতা এবং নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।

সব মিলিয়ে সিপিডির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতি হলেও শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বেসরকারি বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের চাপ রয়েছে। বিশেষ করে আট মাসে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারানোর তথ্য অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর