Thursday 20 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

৫৬ বছরে বাংলাদেশে ২৩ রাষ্ট্রপতি

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২০ আগস্ট ২০২৬ ২৩:০২ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ ২৩:০৯

বঙ্গভবন। ফাইল ছবি

ঢাকা: স্বাধীনতার ৫৬তম বছরে এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ২৫৫ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। এটি ১৯৯১ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন।

স্বাধীনতার পর গত সাড়ে পাঁচ দশকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের সাক্ষী নয়; এর সঙ্গে বদলেছে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিও। কখনো রাষ্ট্রপতি ছিলেন সরকারপ্রধান ও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র, আবার কখনো রাষ্ট্রপতি ছিলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান এবং সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে।

বিজ্ঞাপন

১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত বা সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু হয়। ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আবার মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে।

এই তিনটি পর্যায়কে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস দেখলে দেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

দায়িত্বকাল: ২৬ মার্চ ১৯৭১–১২ জানুয়ারি ১৯৭২

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তখন সরকারব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত—মুজিবনগর সরকারের কাঠামো। স্বাধীনতা ঘোষণার পর শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। পাকিস্তানে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতি পদটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সূচনাপর্বের অংশ। বঙ্গভবনের সরকারি তালিকাতেও ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ রয়েছে।

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী

দায়িত্বকাল: ১২ জানুয়ারি ১৯৭২–২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর তার কোনো দলীয় পরিচয় ছিল না। তার সময়ে সরকারব্যবস্থা ছিল মন্ত্রিপরিষদ শাসিত বা সংসদীয় পদ্ধতির সরকার। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তার সময়েই ১৯৭২ সালের সংবিধান কার্যকর হয় এবং বাংলাদেশ সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি ছিলেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান; আর সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানের মূল কাঠামোতেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী অধিকাংশ দায়িত্ব পালনের বিধান রাখা হয়।

মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ

দায়িত্বকাল: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩–২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫

মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ আওয়ামী লীগের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। তখন সরকারব্যবস্থা ছিল মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার। রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পর দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ মোহাম্মদউল্লাহ। বঙ্গভবনের সরকারি তালিকায় প্রথমে তাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং পরে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। তার রাষ্ট্রপতিত্বের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা বহাল ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটে।

শেখ মুজিবুর রহমান

দায়িত্বকাল: ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫–১৫ আগস্ট ১৯৭৫

শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি থাকলেও পরে বাকশাল গঠন করেন। তার সময়ে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে। সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে তার দ্বিতীয় দফার রাষ্ট্রপতিত্ব ছিল প্রথম দফার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে। এই সময়েই একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে বাকশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

খন্দকার মোশতাক আহমদ

দায়িত্বকাল: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫–৬ নভেম্বর ১৯৭৫

শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবুও তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা। সেই সময়েও দেশে সরকারব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত। ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার মেয়াদ ছিল মাত্র ৮৩ দিনের। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ তাকে সরিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম

দায়িত্বকাল: ৬ নভেম্বর ১৯৭৫–২১ এপ্রিল ১৯৭৭

বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম কোনো দলের নেতা ছিলেন না। বিচারপতি সায়েম দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার সময়ে রাষ্ট্রপতি পদটি ছিল নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৫ সালের শেষ দিক থেকে সামরিক আইন জারি থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি ও সামরিক কর্তৃত্বের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শহিদ জিয়াউর রহমান

দায়িত্বকাল: ২১ এপ্রিল ১৯৭৭–৩০ মে ১৯৮১

জিয়াউর রহমান ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে ছিলেন। তার রাষ্ট্রপতিত্বের সময় বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। ১৯৭৮ সালে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থাতেই তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নেতায় পরিণত হন।

বিচারপতি আবদুস সাত্তার

দায়িত্বকাল: ৩০ মে ১৯৮১–২৪ মার্চ ১৯৮২

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর আবদুস সাত্তার প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং পরে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন। তার রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল ছিল। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার সরকারের পতন ঘটে।

বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী

দায়িত্বকাল: ২৭ মার্চ ১৯৮২–১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩

সামরিক শাসনের সূচনাপর্বে বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে বাস্তব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় অংশ ছিল সামরিক নেতৃত্বের হাতে। ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি পদ ছাড়েন এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

দায়িত্বকাল: ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩–৬ ডিসেম্বর ১৯৯০

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়গুলোর একটি এরশাদের সময়। তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করে পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি গঠন করে তিনি দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ

দায়িত্বকাল: ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০–২০ মার্চ ১৯৯১

এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যায়।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ

দায়িত্বকাল: ২০ মার্চ ১৯৯১–১০ অক্টোবর ১৯৯১

অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৯১ সালে সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। এই পর্যায়েই রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের নির্বাহী প্রধান। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আবদুর রহমান বিশ্বাস

দায়িত্বকাল: ১০ অক্টোবর ১৯৯১–৯ অক্টোবর ১৯৯৬

বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি ছিলেন সংসদীয় সরকারব্যবস্থার প্রথম পূর্ণ মেয়াদের রাষ্ট্রপতিদের একজন। এ সময় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হলেও সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের হাতে ছিল।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ

দায়িত্বকাল: ৯ অক্টোবর ১৯৯৬–১৪ নভেম্বর ২০০১

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সাহাবুদ্দীন আহমদ দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। একই ব্যক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই ভিন্ন রাজনৈতিক সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন— এটি রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী

দায়িত্বকাল: ১৪ নভেম্বর ২০০১–২১ জুন ২০০২

২০০১ সালের বিএনপি সরকারের সময়ে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করা; নির্বাহী ক্ষমতা ছিল প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের হাতে। বিএনপি সরকারের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি হলেও তার সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় তাকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দেয় বিএনপি সরকার।

মোহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার

দায়িত্বকাল: ২১ জুন ২০০২–৬ সেপ্টেম্বর ২০০২

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাকে পূর্ণ মেয়াদের রাষ্ট্রপতির তালিকায় না রেখে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করাই যথাযথ।

অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ

দায়িত্বকাল: ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২–১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটে তিনি একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সময় বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থাতেই ছিল।

মো. জিল্লুর রহমান

দায়িত্বকাল: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯–২০ মার্চ ২০১৩

আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সরকারের নির্বাহী প্রধান। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ২০১৩ সালের ২০ মার্চ তার মৃত্যু হয়।

মো. আবদুল হামিদ

দায়িত্বকাল: ২০১৩ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০২৩

জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার সময় তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় এক দশক রাষ্ট্রপতি পদে থাকা আবদুল হামিদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালনকারীদের একজন।

মো. সাহাবুদ্দিন

দায়িত্বকাল: ২৪ এপ্রিল ২০২৩–২৪ জুলাই ২০২৬

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার দায়িত্বের পুরো সময় বাংলাদেশ সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। সংবিধানের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান; প্রধানমন্ত্রী সরকারের প্রধান। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তার পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ [ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি]

সময়কাল: ২৪ জুলাই ২০২৬ থেকে ২০ আগস্ট ২০২৬

মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে তাকে ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে গণনা করা হচ্ছে না; তিনি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। বঙ্গভবনের বর্তমান ওয়েবসাইটেও হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর—২৩তম রাষ্ট্রপতি

১৯৯১ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেবেন তিনি।

বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল এবার দলের রাজনীতির মাঠ থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাচ্ছেন। তবে তার রাষ্ট্রপতিত্বের সময় বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থা হবে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সংসদীয় ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হবেন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন সরকারের নির্বাহী প্রধান। বর্তমান সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধিকাংশ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন।

তিন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরা

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাসকে মোটামুটি তিনটি সাংবিধানিক পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

প্রথম পর্যায়—১৯৭১ থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫

মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থা। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রপতিরা ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সরকারপ্রধান।

দ্বিতীয় পর্যায়—২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১

রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতিত্ব থেকে শুরু করে খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি সায়েম, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার, আহসানউদ্দিন চৌধুরী ও এরশাদের সময় রাষ্ট্রপতি পদটি নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

তৃতীয় পর্যায়—১৯৯১ থেকে বর্তমান

মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি হন সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হন সরকারের নির্বাহী প্রধান। ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই পরিবর্তন আসে।

৫৬ বছরে আসলে কী বদলেছে

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটির ইতিহাস দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—রাষ্ট্রপতি বদলেছে, সরকারব্যবস্থাও বদলেছে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম রাষ্ট্রপতিত্বের সময় ছিল স্বাধীনতার যুদ্ধ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর্যায়। আবু সাঈদ চৌধুরী ও মোহাম্মদউল্লাহর সময় ছিল সংসদীয় ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতিত্ব থেকে শুরু হয় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা। এরপর সামরিক শাসন ও রাষ্ট্রপতি শাসনের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে ১৯৯১ সালে আবার সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসে।

এর পর সাহাবুদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান বিশ্বাস, বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিন—সবাই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই ধারাবাহিকতার ২৩তম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।

অর্থাৎ ৫৬ বছরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সংখ্যা যেমন দেশের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প বলে, তেমনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিবর্তন বলে দেয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থারও দীর্ঘ পথচলার কথা।

সারাবাংলা/এমএমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর