ঢাকা: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। আর এই নির্বাচনের জন্য এরই মধ্যে সংসদের সরকারিদল ও বিরোধীদল তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। সরকারি দল বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর বিরোধীদল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন এলডিপি প্রধান কর্নেল অলি আহমদ।
যদিও সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। এখন বাকি শুধু নির্বাচনি আনুষ্ঠানিকতার। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে দল ও সরকারের কয়েকটি পদ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন তিনি। মন্ত্রিসভা থেকেও পদত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হলো ‘সংসদ সদস্য পদ’। এটি নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
’৯০-এর পর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় এই প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর আগে সরকারি দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেন। তবে এই নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী হওয়ায় তার সংসদীয় আসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী হবে- সেটা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যদি সরকারি দল বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তাহলে ঠাকুরগাঁও-১ আসন কবে, কখন থেকে শূন্য হবে, কে শূন্য ঘোষণা করবে? এর পর ওই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কবে?
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর যোগ্যতা, অযোগ্যতা সংবিধান ও আইনে নির্ধারিত রয়েছে। সংসদ সদস্যরা এ নির্বাচনে ভোটার। সংসদ সদস্য না হলেও রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়া যাবে। তবে সংসদ সদস্য যদি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন তাহলে পরে আসনটি শূন্য হবে।’ তিনি জানান, সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি হতে আসন শূন্য ঘোষণা করবে সংসদ সচিবালয়। এর পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ আসনের উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে সংবিধানের ৫০ (১) ধারায় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসরের মেয়াদে তাহার পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তার উত্তরাধিকারী-কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। দুই মেয়াদের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়তে পারেন।’
সংবিধানে আরও বলা আছে, রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবে না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পদে থেকে সংসদ সদস্য পদে থাকা যাবে না, এমনকি নির্বাচনে অংশ নেওয়া যাবে না। সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের দিনেই সংসদে তার আসন শূন্য হয়ে যাবে।
তবে কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হলে শুধু নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মন্ত্রিত্ব শেষ হয়ে যায়, এমন সরাসরি বিধান নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তার আর মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদকে সরকারের মন্ত্রিসভার কাঠামোর অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪৮(২) বলছে, রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান।
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মো. আব্দুল আলীম সারাবাংলাকে বলেন, ‘কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হলে, শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আসনটি শূন্য হয়ে যাবে। এর পর সংসদ সচিবালয় থেকে ওই আসন শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেবে। সেই চিঠি পাওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে ওই আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নেবে।’
এ বিষয়ে অতীত ইতিহাসও বলছে, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য স্পিকার আবদুল হামিদ ২০১৩ সালের ২২ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের বিশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন সিইসি ও নির্বাচনি কর্তা বলেছিলেন, ‘আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সংসদের স্পিকার পদ ও কিশোরগঞ্জ-৪ আসন শূন্য হয়ে যাবে।’ এর পর আসনটি শূন্য হলে ২২ মে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছিল ইসি।
এদিকে গতকাল ছিল রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এরপর ১৬ অগাস্ট যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট, সংসদের সভাকক্ষে।
নির্বাচনে সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে একটি আসনে প্রার্থিতা বাতিল রয়েছে। সংরক্ষিত আসনে এমপি আছেন ৫০ জন। সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ সংসদে এবার ৩৪৯ জন এমপি রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। এর মধ্যে সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে বিএনপির সংসদ্য সদস্য ২৪৭ জন, জামায়াতের ৭৭ জন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র আট জন, এনসিপির আট জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের তিন জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, বিজেপির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন, খেলাফত মজলিশের একজন এবং জাগপার একজন সদস্য রয়েছেন সংসদে।
সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচনে বিএনপির মোট ভোটার ২৪৭ জন, আর ১১ দলীয় জোটের মোট ভোটার ১০২ জন। সেই হিসাবে ১৯৯১ সালের পর নির্বাচন হতে যাওয়া দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত। কারণ, ভোটার সংখ্যা অনুযায়ী এগিয়ে বিএনপি।
অপরদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্যের দলের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনের এখন শুধু আইনি প্রক্রিয়াগুলোর আনুষ্ঠানিকতা বাকি।