ঢাকা: দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জল্পনা এখন তুঙ্গে। নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটের তারিখ ঘোষণা করার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে দলীয়ভাবে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক মহলে জোরালো আলোচনা থাকলেও, তিনি যে নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিএনপির একাধিক সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষমতা দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে রয়েছে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নতুন কোনো নাম সামনে আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যা বললেন মির্জা ফখরুল
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম নিয়ে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে দলের স্থায়ী কমিটি তাকে পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে।’
নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। দলে আরও অনেক যোগ্য ব্যক্তি আছেন, তাদেরও মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে।’
কেন আলোচনার কেন্দ্রে মির্জা ফখরুল
বিএনপির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দলের ভেতরে গ্রহণযোগ্যতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকটে তার ভূমিকার কারণে তাকে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনায় এগিয়ে রেখেছে।
দলের ভেতরের সমীকরণ
রাষ্ট্রপতি পদটি মূলত সাংবিধানিক পদ হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন দলের জন্য এ পদটির গুরুত্ব রয়েছে। ফলে বিএনপির কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দলের রাজনৈতিক কৌশলেরও অংশ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চললেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দলের একটি অংশের মতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে শুধু দলীয় নেতাকে নয়, দলের বাইরে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যক্তিকেও বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে—এমন আলোচনা রয়েছে। ফলে শেষ মুহূর্তে মির্জা ফখরুলের পরিবর্তে অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা অপেক্ষাকৃত অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে প্রার্থী করা হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আলোচনায় যারা
মির্জা ফখরুলের পাশাপাশি বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে তাদের কাউকেই এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। ফলে আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাচ্ছেন, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিএনপি এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নিতে চাইতে পারে, যিনি একদিকে দলের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে সক্ষম। এই বিবেচনায় মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে।
দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক মহলে ফখরুল বাদে আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ও নরসিংদী-২ আসনের এমপি ড. আবদুল মঈন খান এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমও হতে পারেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
ভোট গ্রহণ ২০ আগস্ট
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ ভোটার অংশ নেন না। জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যার হাতে থাকে, সাধারণত তার মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। আর যদি একজন বৈধ প্রার্থীই থাকেন, তাহলে ভোট ছাড়াই তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ঘোষণা করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ১৮ আগস্টই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে। তবে, তার আগে আগামী ১৩ আগস্টেই জানা যাবে কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। কারণ, ওইদিন বিএনপির পক্ষ থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে, তিনিই নির্বাচিত হবেন।
শেষ মুহূর্তে চমকের সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তফসিল ঘোষণার পর মির্জা ফখরুলকে ঘিরে আলোচনা তীব্র হলেও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে পর্যন্ত কোনো কিছুই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর।
মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি করা হলে বিএনপির রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তনও আসবে। তিনি বর্তমানে দলের মহাসচিব এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি পদে গেলে তাঁকে দলীয় ও মন্ত্রিসভার সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে সাংবিধানিক দায়িত্বে যেতে হবে। ফলে তাঁর সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হওয়ার সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব পদে কে আসবেন, সেই প্রশ্নটিও সামনে চলে আসবে।
অন্যদিকে তাকে রাষ্ট্রপতি না করে সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্তও বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা কি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নাকি শেষ মুহূর্তে সামনে আসবে নতুন কোনো চমক?
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকায় এখন নির্বাচনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।