ঢাকা: বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জোর আলোচনা। আগামী ১৬ আগস্ট সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে চলেছে। এরই মধ্যে কর্মদক্ষতা, বিতর্ক ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ভিত্তিতে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মূল্যায়ন চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বা কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী কারও কর্মদক্ষতায় সন্তুষ্ট না হলে দফতর পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়াটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার গঠনের শুরুতেই মন্ত্রীদের নির্দিষ্ট সময়ের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের বিষয়টি সামনে আসে। সরকারের প্রথম বৈঠকেই মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যায়নে গুরুত্ব পেতে পারে যেসব বিষয়
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মূল্যায়নে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে অগ্রগতি, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে উদ্যোগ, মাঠ প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সংসদে জবাবদিহির বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দফতর পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সরকারের অভ্যন্তরে এমন ধারণা রয়েছে যে, কয়েকজনের ওপর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থাকায় কাজের চাপ বেড়েছে। ফলে দক্ষতা অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
আলোচনায় যাদের নাম
মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নাম সম্ভাব্য পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে। তবে এসব নামের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মোক্তাদির, সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলম তিনটি করে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এই দুজনকে নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। তবে তাদের সরাসরি বাতিল করা হবে, নাকি অন্য কোথাও রাখা হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ছাড়া আরেকজন পূর্ণমন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র বলছে। তবে তাদের নাম জানা যায়নি।
অন্যদিকে, মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা, তরুণ সংসদ সদস্য এবং মিত্র দলগুলোর কয়েকজন নেতাকে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় থাকতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।
‘বাদ’ নয়, আসতে পারে সতর্কবার্তাও
মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সরকারের ভেতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে—সব বিতর্কিত মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হবে- এমন সিদ্ধান্ত নাও আসতে পারে। বরং, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলনামূলক কম এবং কর্মদক্ষতা উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তাদের সতর্ক করে আরও সময় দেওয়ার নীতিও নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী— এমন তথ্যও এসেছে বিভিন্ন সূত্র থেকে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ে কাজের গতি বাড়ানো, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসেবাকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য রদবদলের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক সমীকরণ নয়, মন্ত্রণালয় পরিচালনায় বাস্তব কর্মদক্ষতাও বড় বিবেচনা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খন্দকার আবদুল মুক্তাদির তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়)। এ ছাড়া, শেখ রবিউল আলম তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে (সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়); মো. আমিন উর রশিদও তিনটি মন্ত্রণালয়ে (কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়); আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দুটি মন্ত্রণালয়ে (অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়); আ ন ম এহছানুল হক মিলন দু’টি মন্ত্রণালয়ে (শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়) দায়িত্ব পালন করছেন।
এর বাইরেও ফকির মাহবুব আনাম স্বপন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং আরিফুল হক চৌধুরী শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দায়িত্ব পালন করছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সুত্র বলছে, যাদের হাতে দু’টি বা তিনটি মন্ত্রণালয় রয়েছে, সেগুলো হয়তো ভাগ করে নতুনদের আনা হতে পারে।
শেষ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
মন্ত্রিসভায় রদবদলের আলোচনা যতই জোরালো হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যদি মনে করেন কোনো মন্ত্রী প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, তাহলে দফতর পুনর্বণ্টন কিংবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’ তবে পরিবর্তনটি ১৮০ দিন পূর্তির আগে না পরে হবে, সে বিষয়ে তখন তিনি নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
এদিকে ১৮০ দিনের মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যেও সতর্কতা বেড়েছে। সরকারের প্রথম ছয় মাসের কাজের গতি, মন্ত্রণালয়ের অর্জন এবং জনমনে সরকারের ভাবমূর্তি— সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বাংলাদেশের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্ত্রিসভায় বড়ধরনের পরিবর্তন হবে, নাকি সীমিত আকারে দফতর পুনর্বণ্টন ও নতুন মুখ যুক্ত করা হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ১৮০ দিনের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নকে ঘিরে সরকারের ভেতরে পরিবর্তনের আলোচনা এখন আর নিছক গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই; এটি রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।