ঢাকা: গত বছর শেষ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ। এমতাবস্থায় সাংগঠনিক নেতৃত্ব পুনর্গঠনে নতুন কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বর্তমানে কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হতে পারে। এরই মধ্যে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিয়ে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে দফায় দফায় আলোচনা চলছে। তবে, এবার ‘সুপার ফাইভ’ নাকি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হবে সেবিষয়েও চলছে নানা আলোচনা।
দলীয় নেতারা জানান, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর এবার স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতৃত্ব পুনর্গঠনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করার সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েই নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
সাংগঠনিক ভারসাম্যে জোর
দলীয় সূত্রের জানায়, এবার শুধু জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ—সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘স্বেচ্ছাসেবক দলকে আগের চেয়ে আরও গতিশীল ও সুসংগঠিত করা হবে। সে লক্ষ্যেই নেতৃত্ব বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’
পদপ্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ
কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বর্তমান ও সাবেক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কেউ কেউ নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণও জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত তদবিরের চেয়ে রাজনৈতিক অবদান, সাংগঠনিক মূল্যায়ন এবং আন্দোলন-সংগ্রামে মামলা, কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার নেতাদের অবদানকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কমিটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সারাদেশে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা, তৃণমূলের ইউনিটগুলো পুনর্গঠন সম্পন্ন করা এবং নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা।
তরুণ ও অভিজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি
দলীয় সূত্র বলছে, এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি আন্দোলনে সক্রিয় তরুণ নেতৃত্বকেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এতে যেমন সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, তেমনি নতুন নেতৃত্বও তৈরি হবে। একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘এমন একটি টিম গঠন করা হচ্ছে, যারা শুধু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাই মোকাবিলা করবে না, ভবিষ্যতের সাংগঠনিক নেতৃত্বও তৈরি করবে।’
পূর্ণাঙ্গ কমিটি নাকি ‘সুপার ফাইভ’?
বিএনপির একাধিক সূত্রের দাবি, প্রথম ধাপে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ আংশিক বা ‘সুপার ফাইভ’ কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, একবারেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আলোচনায় যারা
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান এবং সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন।
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক ছাত্রনেতা কাজী মোক্তার হোসেন, শেখ মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন এবং জহির উদ্দিন তুহিন।
যা বলছেন নেতারা
বর্তমান কমিটির যুগ্ম সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোক্তার হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুনেছি শিগগিরই কমিটি হবে। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাদের দায়িত্ব দেবেন, তাদের নেতৃত্বেই সংগঠন এগিয়ে যাবে।’
বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, ‘বর্তমান কমিটির তিনজন নেতার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান শিগগিরই নতুন কমিটি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।’
তিনি জানান, বর্তমান সভাপতি এস এম জিলানী দেশের বাইরে থাকায় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী, সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান এবং তিনি নিজে।
নাজমুল হাসান বলেন, ‘কমিটি নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। সাংগঠনিক অভিভাবক যাদের দায়িত্ব দেবেন, আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করব। আমাকে দায়িত্ব দিলে আগের মতোই দলের জন্য কাজ করার চেষ্টা করব।’
উল্লেখ্য, ১৯ আগস্ট ১৯৮০ সালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় সাংবাদিক কাজী সিরাজকে আহ্বায়ক করে ২৩ সদস্যের প্রথম কমিটি গঠন করা হয়। পরে ১৯ আগস্ট ১৯৮৫ সালে কাজী আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ২৯ সদস্যের নতুন কমিটি গঠিত হয়। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রায় এক বছর অতিবাহিত হওয়ায় নতুন কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা হচ্ছে শিগগিরই, এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।