Friday 17 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পড়াশোনা নিরবের, স্বপ্ন আর্মি অফিসার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপনডেন্ট
১৭ জুলাই ২০২৬ ২৩:৫৩

কুপির তেল ফুরিয়ে গেলে বই-খাতা হাতে রেলস্টেশনের ল্যাম্পপোস্টের নিচে ছুটে যায় নিরব। ছবি: সারাবাংলা

নীলফামারী: চারদিকে যখন বিদ্যুতের ঝলমলে আলো, তখনও নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের পাশের একটি ছোট্ট অন্ধকার ঘরে কুপির ক্ষীণ আলোয় জীবন কাটছে ৭ বছরের শিশু নিরব ও তার মা রুপসানা বেগমের। কুপির তেল ফুরিয়ে গেলে বই-খাতা হাতে নিরব ছুটে যায় রেলস্টেশনের দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে। সেখানকার ল্যাম্পপোস্টের আলোই তার পড়ার টেবিল, আর সেই আলোয় আঁকা হচ্ছে এক বড় স্বপ্ন—আর্মি অফিসার হয়ে মায়ের সব কষ্ট দূর করার স্বপ্ন।

নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি ছোট্ট ঘরেই মা-ছেলের বসবাস। নিরবের বয়স যখন মাত্র ১৬ মাস, তখনই তার বাবা অন্যত্র বিয়ে করে তাদের ছেড়ে চলে যান। এরপর থেকেই সংগ্রাম যেন নিত্যসঙ্গী। বড় ভাই রিফাত (১৬) ঢাকায় রাজমিস্ত্রীর কাজ করে যে সামান্য আয় করেন, সেটিই সংসারের একমাত্র ভরসা।

বিজ্ঞাপন

ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় মা রুপসানা বেগম নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। অনেক সময় তিনবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়ে। মাছ-মাংস যেন তাদের কাছে বিলাসিতা। সেই অভাবের মধ্যেও স্থানীয় একটি মাদরাসায় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে নিরব।

ভবিষ্যতের মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর বিষয়ে নিরব বলেন, ‘আমার মা আমার জন্য অনেক কষ্ট করেন। আমি বড় হয়ে আর্মি অফিসার হতে চাই। মায়ের সব কষ্ট দূর করতে চাই।’

মায়ের কণ্ঠেও একই স্বপ্ন। রুপসানা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেটাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু তাকে ভালোভাবে পড়ানোর মতো সামর্থ্য নেই। মানুষের সহযোগিতায় তাকে পড়াচ্ছি। সে আর্মি অফিসার হোক বা অন্য কিছু, একজন ভালো মানুষ হোক—এটাই আমার চাওয়া। মাদরাসার শিক্ষকও বলেন, আমার ছেলে খুব মেধাবী। কিন্তু অভাবের কারণে তার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’

স্থানীয়দের কাছেও নিরব পরিচিত এক অধ্যবসায়ী শিশু হিসেবে। তারা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই বই-খাতা নিয়ে স্টেশনের আলোয় বসে যায় নিরব।

স্থানীয় বাসিন্দা মিরাজ হোসেন বলেন, ‘আমরা রাতে এখানে ক্রিকেট খেলি। প্রতিদিন দেখি নিরব ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে পড়ছে। খেলাধুলার চেয়ে পড়াশোনার প্রতিই তার আগ্রহ বেশি।’

আরেক বাসিন্দা হোসাইন বাবু বলেন, ‘ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু পরিবারটি খুবই অসহায়। তার মা একাই জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে নিরব অনেক দূর যেতে পারবে।’

অভাবের কারণে শুধু পড়াশোনাই নয়, পুষ্টিকর খাবারের অভাবেও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে নিরব। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যথাযথ সহায়তা না পেলে তার পড়াশোনা একসময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

নীলফামারী রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মিঠুন রায়ও প্রতিদিন নিরবকে স্টেশনের আলোয় পড়তে দেখেন। তিনি বলেন, ‘সন্ধ্যা হলেই ছেলেটি বই নিয়ে স্টেশনে চলে আসে। তার শেখার আগ্রহ সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। পারিবারিক সংকট না থাকলে তাকে এখানে এসে পড়তে হতো না। সমাজের মানুষ যদি তার পাশে দাঁড়ায়, তাহলে এই শিশুটি একদিন অবশ্যই ভালো কিছু করবে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর