ঢাকা: বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কমিটির মেয়াদ সাধারণত তিন বছর। এই তিন বছরের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি কাজ করার কথা। কিন্তু, চলতি আংশিক কমিটির মেয়াদ দুই বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে মাত্র সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটি দিয়ে চলছে সংগঠনটি। এতে পদপ্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
তবে সম্প্রতি বিভিন্ন ইউনিটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতবিনিময়ের পর যুবদলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ৯ জুলাই মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। সে সময় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, আংশিক কমিটিকে কেন্দ্র করে সভাপতি মোনায়েম মুন্নার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটির একটি খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের যেসব নেতা বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন তারা কেউ এখন আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি চান না। বরং, সবার আগ্রহ এখন নতুন কমিটিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের সাবেক এক নেতা সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটির নেতারা দুই বছরেও একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেননি। সেজন্য পদপ্রত্যাশীরা এখন চাচ্ছেন নতুন কমিটি। নতুন কমিটি হলে দল চাঙ্গা হবে। নতুন নেতৃত্ব আসবে।’
জানা গেছে, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উৎপাদনমুখী রাজনীতি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ২৭ অক্টোবর যুবদল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । তবে বর্তমানে সংগঠনটি সে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছে বলে মনে করেন অনেক সিনিয়র নেতা। কেউ কেউ বলেন, সেই যুবদল এখন আর নেই। যে যুবদলের নেতৃত্বে ছিলেন আবুল কাশেম (প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, পরবর্তীতে সভাপতি) এবং সাইফুর রহমান (প্রথম সাধারণ সম্পাদক)।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠায় সংগঠনের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সূত্রমতে, এরই মধ্যে ১৫১ এবং ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট দুটি খসড়া তালিকা বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে পদপ্রত্যাশীদের অভিযোগ, এই তালিকায় ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন করে শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
যুবদল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে আবুল কাশেমকে আহ্বায়ক করে যুবদলের কমিটি গঠন করা হয়। এর পর আবুল কাশেমকে সভাপতি ও সাইফুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়। যুবদলের দ্বিতীয় কমিটি হয় ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ। কাউন্সিলের মাধ্যমে ওই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন মির্জা আব্বাস। আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আব্বাস-গয়েশ্বর কমিটি সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় পরের কমিটিতেও তারা নেতৃত্বে আসেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর কাউন্সিলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই দু’জন আবার যুবদলের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সময়ের পরিক্রমায় তারা এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।
কারা আসতে পারেন নতুন নেতৃত্বে
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবদলের কমিটি নতুন করে হলে এই কমিটির সভাপতি পদে আসতে পারেন বর্তমান আংশিক কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম পল, সাবেক কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিন আকিল। এ ছাড়া দলের হাইকমান্ড চাইলে বর্তমান কমিটির সেক্রেটারি ভোলা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়নও সভাপতি পদে থাকতে চান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক নেতা সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘যুবদলের সভাপতি পদে বিগত দিনে বরকত উল্লাহ বুলু এমপি থেকেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নকে সভাপতির দায়িত্ব দিলে তিনি ভালো করবেন। আর হাইকমান্ড যদি দায়িত্ব দেয় তাহলে দলের জন্য ভালো হবে।’
এদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে যেসব নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- ছাত্রদলের সাবেক সেক্রেটারি আকরামুল হাসান, মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহবায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম, বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল, দক্ষিণের সাবেক সভাপতি গোলাম মাওলা শাহীন, দক্ষিণের বর্তমান সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, বর্তমান কমিটির দফতর সম্পাদক কামরুজ্জামান দুলাল, মহানগর উত্তরের আহবায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল প্রমুখ।
অপরদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রদল নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন- ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাবেক সেক্রেটারি ইকবাল হোসেন শ্যামল, সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রমুখ।
জানতে চাইলে বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম পল সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান কমিটি পূর্ণাঙ্গ হবে না কি নতুন করে কমিটি হবে এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত দেবেন। তিনি যা সিদ্ধান্ত দেবেন, যাকে নেতৃত্ব দেবেন, আমরা সেই সিদ্ধান্ত মেনে দলের জন্য কাজ করব।’
যুবদলের বিগত কমিটির দ্বিতীয় সহসভাপতি রুহুল আমিন আকিল সারাবাংলাকে বলেন, ‘নতুন কমিটি হবে না কি পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে এ বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। তবে বিভিন্ন মিডিয়ায় নিউজ দেখলাম কমিটি হবে। দলের হাইকমান্ড আমাদের এখনো কিছু জানায়নি।’
নতুন কমিটি হলে আপনি কোনো পদপ্রত্যাশী কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিগত দিনে দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি। এখনো করছি। চেয়ারম্যান যেকোনো দায়িত্ব দিলে তা সঠিকভাবে পালনের চেষ্টা করব।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি সবসময় দলের হাই কমান্ডের নির্দেশ মেনে রাজনীতি করি। যুবদলের কমিটি কেমন হবে সে বিষয়ে আমার কোনো ব্যক্তিগত বক্তব্য নেই। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যখন যেখানে দায়িত্ব দেবেন সেখানে দায়িত্ব পালন করব।’
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই যাদের নিয়ে আংশিক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল তারা হলেন- সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, সিনিয়র সহ-সভাপতি রেজাউল করিম পল, সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল ও দফতর সম্পাদক নুরুল ইসলাম সোহেল।