Thursday 16 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বিএনপির সঙ্গে থেকেও বঞ্চিত যারা

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ২২:২৫ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ২২:২৭

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: দীর্ঘ ১৭ বছর শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে ছিল কমবেশি ৪৩টি দল। এর মধ্যে সক্রিয় ছিল অন্তত ৩৩টি। আন্দোলনের দিনগুলোতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতেন। স্কাইপিতে দেওয়া সেসব বক্তব্যে তিনি জোটবদ্ধ দলগুলোর নেতাদের আশ্বাস দিতেন- যারা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে শরিক থাকবে, নির্বাচনে বিজয়ী হলে তাদের নিয়ে সরকার গঠন করা হবে। কিন্তু এরই মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও তিনটি দলের তিন জন ছাড়া কেউ নেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন তারেক রহমানের সরকারে। এতে শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করলেও কেউ মুখ খুলছেন না। সবাই আশায় আছেন- যদি কোনো পদ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ৩৩টি দলের মধ্যে কয়েকটি দলের নেতারা তাদের দল ছেড়ে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের দল থেকে নির্বাচন করেছেন বিএনপির সমর্থন নিয়ে। তাদের মধ্যে অনেকের আসনে আবার বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীও ছিল। নির্বাচনের পরে সব হিসাব-নিকাশ পালটে জনসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণ-অধিকার পরিষদের নুরুল হক নূর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। এ ছাড়া, নিজের দল থেকে সরে এসে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজও।

ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ বিজেপির চেয়ারম্যান। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন তার পিতা এরশাদের এক সময়ের সহযোদ্ধা নাজিউর রহমান মঞ্জু। এরশাদ যখন চারদলীয় জোট ভেঙ্গে দিয়ে বেরিয়ে যায়, তখন নাজিউর রহমান জাতীয় পার্টি ছেড়ে বিজেপি গঠন করে বিএনপি জোটে থেকে যান। তার মৃত্যুর পর দলটির চেয়ারম্যান হন ব্যারিস্টার আন্দালিভ।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে বিএনপি জোট থেকে বের হয়ে যান পার্থ। পরে আবার বিএনপির সঙ্গেই যোগ দেন। তিনি বিবাহ করেছেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালের মেয়েকে। তবুও হাসিনার শেষ সময়ে জেল খাটতে হয়েছিল তাকে। রাজনীতি সচেতন মানুষ ভেবেছিল তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে আন্দালিভ রহমান নির্ঘাত মন্ত্রী হবেন। কিন্তু সেই তালিকায় তার নাম এখনো ওঠেনি।

নিজের দল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ নিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হলেও সরকারি কোনো পদ পাননি। সংসদ সদস্য হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাকে।

জুলাই আন্দোলনের অনেক আগে থেকেই নাগরিক ঐক্য দলটি বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। দলের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগ ছেড়ে নাগরিক ঐক্য গঠনের পর থেকে বিএনপির প্রতি ঝুঁকে ছিলেন। ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি জোট থেকে একটি নমিনেশন পাবেন এমন আশায় থাকলেও সে আশা পূরণ হয়নি। পরে ভেবেছিলেন- এমপি না হলেও কিছু একটা পাবেন। কিন্তু বিএনপি সরকারের বয়স দুই মাস মাস পার হলেও মান্নার কপালে কিছু জোটেনি। তবে টকশো কাঁপিয়ে মান্নার এক সময়ের সহযোদ্ধা ডা. জাহেদ-উর রহমান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদ বাগাতে সক্ষম হয়েছেন।

কমরেড সাইফুল হক। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে ছিলেন। তবে জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়নি। সেই সাইফুল হক ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি জোটের মনোনয়ন পেয়েও পরাজিত হয়েছেন জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে। এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো পদে তাকে দেখা যাচ্ছে না। তবে তার কারণে বিএনপি ত্যাগী নেতা সাইফুল আলম নীরব বহিষ্কার হয়ে আছেন।

অপরদিকে বিএনপির শরিকদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র নেতা ছিলেন জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার। বয়সের কারণে অনেকটা ন্যুজ্ব এই নেতার পিরোজপুর-১ আসনে বিএনপি জোটের মনোনয়ন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ওই আসনে বিএনপি তাদের নিজ দলের প্রার্থী দেয়। তখন অনেকে ভেবেছিলেন সরকার গঠন করলে মোস্তফা জামাল হায়দার টেকনোক্রেট মন্ত্রী হতে পারেন। কিন্তু তিনি কোনো পদ পাননি। এমনকি তার দলের কেউ-ই পদ পায়নি।

ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ শওকত হোসেন নীলু। ২০১০ সালের পর দীর্ঘদিন বিএনপি জোটে ছিলেন এনপিপি নেতারা। এক পর্যায়ে জোট থেকে বের হয়ে যান নীলু। তখন তার মহাসচিব ছিলেন আইনজীবী ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। তিনি নীলুর সঙ্গে জোট ভাঙায় শরিক না হয়ে এনপিপির ভগ্নাংশ নিয়ে থেকে যান ২০ দলীয় জোটে। পরে ২০দলীয় জোট ভেঙে গেলে ১১টি দল নিয়ে গঠিত জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের নেতৃত্বে ছিলেন এই ফরহাদ। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে নানা নাটকীয়তার পর মনোনয়ন পেলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। ফলে সরকারে কোনো পদ-পদবি তিনিও পাননি।

দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হওয়ায় সরকারের কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না। একই অবস্থা লিবারেল ডেমোক্রেটি পার্টির সাবেক মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ। তিনি এলডিপি থেকে পদত্যাগ করে কুমিল্লা-৭ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে ধরাশায়ী হন। তাকেও সরকারের কোনো পদে দেখা যাচ্ছে না।

জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের দুটি অংশই ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে ছিল। বিএনপির কাছ থেকে দুই দলের পাঁচ নেতা মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু একজনও নির্বাচিত হতে পারেননি। আর নির্বাচনের পরে এই দু’টি দলের কাউকে বিএনপির আশে পাশে আর দেখা যাচ্ছে না।

মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ভোটের আগেই বিএনপি জোট ছাড়েন এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। তিনি ১১দলীয় ঐক্যে যোগ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। তিনি নিজে নির্বাচনে অংশ না নিলেও তার ছেলে ১১দলীয় প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছেন।

মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি ছেড়ে জামায়াত জোটে যায় আরও কয়েকটি দল। তার মধ্যে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা অন্যতম। এই দল দুটির মধ্যে লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ২০১৮ সালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে মনোনয়ন পেলেও ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে ঘোষণা দিয়ে বিএনপি জোট ছেড়ে দেন। পরে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১দলীয় নির্বাচনি ঐক্যে যোগ দেন।

আর শফিউল আলম প্রধানের রেখে যাওয়া দল জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি তিন ভাগে বিভক্ত হয়। এক ভাগের নেতৃত্বে রয়েছেন তার মেয়ে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান ও ছেলে ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান। ২০১৮ সালে ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান জোটের মনোয়ন না পেয়ে বিএনপি থেকে দূরে চলে যান। আর ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে তারা জামায়াত জোটে থাকেন। তবে এই দল থেকে কেউ নির্বাচনে অংশ নেয়নি।

গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গেই ছিলেন। তাদের দল গণফোরাম ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে। সেসময় নেতৃত্বে ছিলেন ড. কামাল হোসেন। এই দলটি বহুবছর ধরে বিএনপির সঙ্গে থাকলেও সুব্রত চৌধুরীসহ কেউ কোনো পদ-পদবি পাননি। পাননি মনোনয়নও।

জানতে চাইলে সুব্রত চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরাতো দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে আছি। আন্দোলন-সংগ্রাম একসঙ্গে করেছি। এখনো তাদের সঙ্গেই আছি। সমর্থন প্রত্যাহার করার মতো সময় এখনো হয়নি।’ একসঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেরকম কথাতো ছিল। তবে তারা কয়েকজনকে নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। আরও কিছুদিন দেখতে চাই তারা কী করেন।’

সরকারি পদ না পেয়ে সাইড লাইনে আছেন বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামের সাথী ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ন্যাপ, মুসলিম লীগ, সাম্যবাদী দল, মাইনরিটি পার্টি, জাগপা (লুৎফর), ডেমোক্রেটিক লীগ, ইসলামিক পার্টি, এনডিপি, পিপলস লীগের শীর্ষ নেতারা। সবার আশা সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে কিছু না কিছু পাবেন।

সারাবাংলা/এমএমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর