Sunday 16 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

স্থায়ী কমিটির নতুন ৪ মুখ নির্বাচনে যে বার্তা দিল বিএনপি

মো. মহসিন হোসেন স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৬ আগস্ট ২০২৬ ২২:২৬

বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন চার মুখ- রুহুল কবির রিজভী, আমান উল্লাহ আমান, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চার নেতাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন- দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমান উল্লাহ আমান, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।

১৫ আগস্ট বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলের সাংগঠনিক গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। দল আশা প্রকাশ করেছে, নতুন চার নেতা তাদের মেধা, বিচক্ষণতা ও সুচিন্তিত পরামর্শের মাধ্যমে দল ও জনগণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবদান রাখবেন। চারজন যুক্ত হওয়ার পর স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা ১৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন এই চার সদস্যের তালিকা বিশ্লেষণ করলে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের প্রয়োজন ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের কয়েকটি দিক স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিনের মাঠের রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং পেশাজীবী মহলের প্রতিনিধিত্ব—চার ধরনের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে এবারের নির্বাচনে।

রিজভী আহমেদ: মাঠের রাজনীতির পরিচিত মুখ

চারজনের মধ্যে রুহুল কবির রিজভীর অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাশিতই ছিল। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন এবং সর্বশেষ জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে তার সক্রিয় উপস্থিতি তাকে দলের মাঠ পর্যায়ের রাজনীতিতে পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।

বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে রিজভী নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন, কর্মসূচি ঘোষণা এবং দলীয় অবস্থান তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয় ঘিরে সংঘর্ষের পর গ্রেফতার হওয়া নেতাদের মধ্যেও তার নাম ছিল। ২০২৪ সালেও নয়াপল্টনে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে একদিকে দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি, অন্যদিকে মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও সরাসরি যুক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আমানউল্লাহ আমান: ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির পরীক্ষিত নেতা

নতুন চার সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের একজন আমানউল্লাহ আমান। ১৯৯০-৯১-এর জন্য তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসা এই নেতা পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি অংশ নিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়েও ঢাকা-৩ আসন থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি ঢাকা-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন।

আমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বড় বৈশিষ্ট্য হলো—ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব থেকে সরাসরি জাতীয় রাজনীতির মাঠে তার দীর্ঘ উপস্থিতি। বিএনপির রাজনীতিতে আন্দোলন, নির্বাচন এবং সংগঠন—তিন ক্ষেত্রেই তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাকে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করার মাধ্যমে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পুরোনো ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

ইসমাইল জবিউল্লাহ: প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সংযোজন

চার জনের মধ্যে ইসমাইল জবিউল্লাহর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। তিনি সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং অবসরের পর বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন। ২০২৬ সালের শুরুতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিএনপির গঠিত ৪১ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে তাঁকে প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

জুনে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অব এশিয়ান পলিটিক্যাল পার্টিজ—আইসিএপিপির স্থায়ী কমিটির সদস্যও মনোনীত হন তিনি। বিএনপির পক্ষ থেকে তার নাম প্রস্তাব করেছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে ইসমাইল জবিউল্লাহকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রশাসন, নীতি প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এমন একটি সময়ে, যখন একটি রাজনৈতিক দলের জন্য শুধু আন্দোলন বা নির্বাচনী রাজনীতি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ফরহাদ হালিম ডোনার: পেশাজীবী ও চিকিৎসক নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্ব

নতুন চার সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেশাগত বৈচিত্র্য এনেছেন অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার। চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতেও তার নাম ছিল। দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে তাকে সক্রিয় দেখা গেছে।

ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) প্রধান উপদেষ্টা এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অন্তর্ভুক্তির মধ্য দিয়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে চিকিৎসক ও পেশাজীবী মহলের প্রতিনিধিত্ব আরও দৃশ্যমান হলো। স্বাস্থ্যনীতি, চিকিৎসাব্যবস্থা, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার মতো বিষয়ে তার পেশাগত অভিজ্ঞতা দলের ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়নে কাজে লাগতে পারে।

চারজনকে নির্বাচন যে বার্তা দিচ্ছে

বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্যের পেশাগত ও রাজনৈতিক পটভূমি পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—একটি মাত্র রাজনৈতিক ঘরানা থেকে তাদের বাছাই করা হয়নি।

রুহুল কবির রিজভী প্রতিনিধিত্ব করছেন দীর্ঘদিনের আন্দোলনমুখী ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক রাজনীতিকে। আমানউল্লাহ আমান এসেছেন ছাত্ররাজনীতি ও নির্বাচনী রাজনীতির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে। ইসমাইল জবিউল্লাহ এনেছেন প্রশাসন, নীতি প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা। আর ফরহাদ হালিম ডোনার প্রতিনিধিত্ব করছেন চিকিৎসক ও পেশাজীবী মহলের।

অর্থাৎ নতুন চার সদস্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে একই সঙ্গে মাঠের রাজনীতি, নির্বাচনি অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং পেশাগত জ্ঞান—এই চারটি উপাদানের সমন্বয় ঘটেছে। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চারজনই আগে থেকেই দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

রিজভী ছিলেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব; আমানউল্লাহ আমান, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম ডোনার ছিলেন চেয়ারপারসনের বিভিন্ন পর্যায়ের উপদেষ্টা বা গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে। ফলে তাদের অন্তর্ভুক্তিকে হঠাৎ করে নতুন মুখ আনার চেয়ে দলের ভেতরে পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হিসেবেই বেশি দেখা যায়।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্তিই অবশ্য এই চার নেতার জন্য শেষ ধাপ নয়। বরং এখন তাদের সামনে আরও বড় দায়িত্ব—দলের নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নের উপযোগী করে তোলা।

বিশেষ করে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং পেশাজীবী নেতা ফরহাদ হালিম ডোনারের ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নে তাদের বিশেষজ্ঞ জ্ঞান কতটা কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে রিজভী ও আমানউল্লাহ আমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দলের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিও নজরে থাকবে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব আবদুস সালাম আজাদ এমপি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে নতুন চার সদস্যের অন্তর্ভুক্তি শুধু চারটি শূন্য পদ পূরণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং দলটির নীতিনির্ধারণী কাঠামোয় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার নতুন সমন্বয় তৈরির একটি প্রচেষ্টা। এখন দেখার বিষয়, এই চার নেতা তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লাগিয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘এই চার নেতার পদোন্নতিকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এই চার নেতাকে সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামে পদায়ন করে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। আশা করি যাদের পদোন্নতি দিয়েছেন তারাও তাদের সুনাম ধরে রাখবেন এবং দলকে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাবেন।’

সারাবাংলা/এমএমএইচ/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

মো. মহসিন হোসেন - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর