ঢাকা: দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আমানতে সামান্য ভাটা পড়লেও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রফতানি আয়, আমদানি নিষ্পত্তি ও প্রবাসী আয় আহরণে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ও বিনিয়োগে ইসলামী ব্যাংকগুলোর শক্ত অবস্থান এখনো অটুট রয়েছে। দেশের মোট ব্যাংকিং খাতের আমানতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বরের তুলনায় আমানত কমেছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। তবে এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় আমানত বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকগুলোর হাতে রয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগ ও অগ্রিম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। তিন মাসে বিনিয়োগ বেড়েছে ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা । দেশের মোট ব্যাংক ঋণের ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) কমে ০.৯০-এ নেমেছে, যা ডিসেম্বর শেষে ছিল ০.৯৪। একই সময়ে অতিরিক্ত তারল্য সামান্য কমে ১৯ হাজার ২০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও এক বছর আগের তুলনায় অতিরিক্ত তারল্যের অবস্থান ভালো, তবে প্রান্তিক ভিত্তিতে তারল্যের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইসলামী ব্যাংকে আমানত প্রত্যাহারের চাপ, খেলাপি ও দুর্বল সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং শরিয়াহভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে খাতটি চাপে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি ইসলামী ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও প্রথম প্রান্তিকে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানি নিষ্পত্তি ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায় নেমেছে। প্রবাসী আয়ও কমেছে ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ১১ কোটি টাকা। তবে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আসা মোট রেমিট্যান্সের ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন গেছে বৃহৎ শিল্পে, যার অংশ ৩৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এরপর রয়েছে বাণিজ্য খাত, যেখানে বিনিয়োগের অংশ ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে বিনিয়োগের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সিএমএসএমই খাতে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
তবে কৃষি অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর কৃষি বিনিয়োগ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা বেশি। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার বেড়ে হয়েছে ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
সবুজ অর্থায়ন, নারী উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র অর্থায়নেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। মার্চ শেষে গ্রিন ফাইন্যান্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা এবং ইসলামী ক্ষুদ্র অর্থায়নের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০টি শাখা রয়েছে। এ ছাড়া ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ৪৯টি ইসলামী শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ৯৭৬টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালু রয়েছে। সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৯টি। মার্চ শেষে এ খাতে কর্মরত জনবল বেড়ে হয়েছে ৪৮ হাজার ৯৩৫ জন।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ইসলামী ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সুশাসন, জবাবদিহি ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় সেবা সম্প্রসারণ, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত মুনাফা-লোকসানভিত্তিক (পিএলএস) বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।