Sunday 21 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ব্যাংক খাতে বিস্তার বাড়লেও ইসলামী ধারার অংশীদারিত্বে ভাটা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২১ জুন ২০২৬ ১৮:৪৫ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ ১৮:৪৭

ঢাকা: দেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে। তবে সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার তুলনায় এ খাতের বাজার অংশীদারিত্ব কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় আহরণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ কমে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলো এখনো শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের প্রকাশিত ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স স্ট্যাটিস্টিকসে সর্ব শেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা ও উইন্ডো মিলিয়ে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ২ হাজার ৭৪৭টি শাখা ও উইন্ডোর মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংক, ১৭টি ব্যাংকের ইসলামী শাখা এবং ১২টি ব্যাংকের ইসলামী উইন্ডো।

বিজ্ঞাপন

আমানত বেড়ে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা
এপ্রিল শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৪ লাখ ৪১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। মার্চের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ০.৩৮ শতাংশ।

তবে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের মোট আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অংশ নেমে এসেছে ২১ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা এক বছর আগে ছিল ২২ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ মোট আমানতে ইসলামী ব্যাংকের অংশ কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংক খাতের অস্থিরতার কারণে কিছু আমানতকারী প্রচলিত ব্যাংকের দিকে ঝুঁকেছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি, তারল্য সহায়তা এবং দুর্বল ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপের ফলে আমানতকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে ফিরছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আমানতের ৮৭ দশমিক ২১ শতাংশই এসেছে মুদারাবাভিত্তিক হিসাব থেকে। আবার মোট আমানতের ৯০ দশমিক ২০ শতাংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে।

বিনিয়োগ ৫ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা
এপ্রিল শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৯২ হাজার ৭৮ কোটি টাকা, যা এক বছর আগে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২৬ শতাংশ।

তবে দেশের মোট ব্যাংকিং বিনিয়োগের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের অংশ কমে ২৪ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ।

বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ৪৪ শতাংশ, হয়েছে বাই-মুরাবাহা পদ্ধতিতে। এরপর রয়েছে এইচপিএসএম (হায়ার পারচেজ শিরকাতুল মেলক) ১৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং বাই-মুয়াজ্জল ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার অস্থিরতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলো তুলনামূলক সতর্ক বিনিয়োগ নীতি অনুসরণ করছে।

সম্পদ বেড়েছে, কিন্তু অংশীদারিত্ব কমেছে
এপ্রিল শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৫৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এক বছর আগে এ পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

কিন্তু দেশের মোট ব্যাংক খাতের সম্পদের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ১৯ শতাংশে, যা এক বছর আগে ছিল ২১ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের চাহিদা বাড়লেও সীমিত পণ্যের বৈচিত্র্য ও কার্যক্রমের পরিধি দ্রুত প্রবৃদ্ধিতে বাধা হয়ে রয়েছে।

রফতানি আয়ে অংশ কমেছে
এপ্রিল মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৭১০ মিলিয়ন ডলার, যা মার্চের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি হলেও এক বছর আগের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ কম।

দেশের মোট রফতানি আয়ের মাত্র ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। বাকি ৮০ শতাংশের বেশি এসেছে প্রচলিত ব্যাংকের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, রফতানি খাতে বাজার অংশ বাড়াতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে সেবার মান ও সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

আমদানি পরিশোধে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি
এপ্রিল মাসে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আমদানি দায় পরিশোধ হয়েছে ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার, যা মার্চের তুলনায় ৪১ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।

মোট আমদানি পরিশোধে ইসলামী ব্যাংকের অংশ ছিল ১৯ দশমিক ১৪ শতাংশ।

প্রবাসী আয় আহরণে দুর্বলতা
এপ্রিল মাসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে ৬২৬ মিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয়। মার্চের তুলনায় তা প্রায় ১১ শতাংশ কম হলেও এক বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

মোট প্রবাসী আয়ের ২০ শতাংশের মতো এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাজার অংশ হারানো ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য উদ্বেগের বিষয়। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তি শক্তিশালী করতে প্রবাসী আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ইসলামী ব্যাংকের আধিপত্য
এজেন্ট ব্যাংকিং আমানতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। এপ্রিল শেষে এ খাতে ইসলামী ব্যাংকের আমানত দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

মোট এজেন্ট ব্যাংকিং আমানতের ৫৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ এখন ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। অর্থাৎ এই খাতে প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান শক্তিশালী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল সেবা বিস্তারের কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলো এ খাতে এগিয়ে রয়েছে।

জনবল কমেছে
এপ্রিল শেষে ইসলামী ব্যাংকিং খাতে মোট কর্মরত জনবল দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২০৮ জন, যা এক বছর আগের তুলনায় ৭ দশমিক ৬ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ডিজিটালাইজেশন, স্বয়ংক্রিয়তা এবং কিছু পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকে ব্যবস্থাপনাগত সংকটের কারণে জনবল কমেছে। তবে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে বিশেষায়িত জনবলের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে পৌঁছেছে, যা এক বছর আগে ছিল ৫৬৬ জন।

এনবিএফসিতেও ধীর সম্প্রসারণ
ইসলামী নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফসি) আমানত এপ্রিল শেষে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। সম্পদ বেড়েছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে বিনিয়োগ প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, শরিয়াহসম্মত আর্থিক পণ্যের চাহিদা বাড়লেও সীমিত বিনিয়োগ সুযোগ, তারল্য চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে ইসলামী এনবিএফসিগুলোর প্রবৃদ্ধি সীমিত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিস্তার অব্যাহত থাকলেও অধিকাংশ সূচকে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি। ফলে মোট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকের অংশ কিছুটা কমেছে। তবে গ্রাহকের চাহিদা, শরিয়াহভিত্তিক অর্থায়নের প্রসার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহায়তার ফলে খাতটি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগোচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর