ঢাকা: বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মূল্যস্ফীতি কমে এক অঙ্কে নেমে এসেছে, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, রাজস্ব আদায়েও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং শিল্প খাতে ঋণ বিতরণও বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে উন্নতি দেখা গেলেও বেসরকারি খাতে ঋণের ধীর প্রবৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের উচ্চ হার অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদের ইউনিট প্রকাশিত ৫ জুলাইয়ের সাপ্তাহিক নির্বাচিত অর্থনৈতিক সূচক থেকে দেশের অর্থনীতির এ সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে।
রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম উচ্চ প্রবৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্য রক্ষায় এই রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং হুন্ডি নিরুৎসাহিত করার পদক্ষেপের ইতিবাচক প্রভাব এ প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
রফতানিতে ইতিবাচক ধারা
বিদায়ী অর্থবছরে দেশের পণ্য রফতানি ৪৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের চাহিদাও ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে।
রফতানির এ ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং অর্থনীতির বহিঃখাতকে শক্তিশালী করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আমদানিতে ফিরছে গতি
একই সময়ে সিঅ্যান্ডএফ ভিত্তিতে আমদানি হয়েছে ৬৮ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার এবং এফওবি ভিত্তিতে ৬৪ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২ দশমিক ৪৪ ও ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি বৃদ্ধি উৎপাদন কার্যক্রমে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির গতি এখনও তুলনামূলক কম, যা নতুন শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে।
রিজার্ভে উন্নতি
৩০ জুন ২০২৬ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে ৩২ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রিজার্ভ বেড়েছে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কিছুটা কমে আসার ফলে রিজার্ভ পরিস্থিতিতে উন্নতি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি
মে ২০২৬ শেষে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এক বছর আগে যা ছিল ১০ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতিও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি, চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকির প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর পড়তে শুরু করেছে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।
বেসরকারি ঋণে ধীরগতি
এপ্রিল ২০২৬ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি দীর্ঘদিনের মধ্যে অন্যতম নিম্ন প্রবৃদ্ধি।
ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদের হার, আমদানি ব্যয় এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন ঋণ গ্রহণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি ঋণ বেড়েছে
একই সময়ে সরকারের প্রতি ব্যাংক খাতের নিট ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের বেশি হয়েছে। ফলে সরকারের অর্থায়নে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য।
রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি
২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করেছে। যদিও প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ২৩ শতাংশ, তবুও রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে।
এলসি কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, পেট্রোলিয়ামসহ বিভিন্ন পণ্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও নিষ্পত্তি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে মূলধনি যন্ত্রপাতির এলসি কিছুটা কমেছে, যা নতুন বিনিয়োগের ধীরগতির প্রতিফলন হতে পারে।
কৃষি, এসএমই ও শিল্পঋণে অগ্রগতি
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। একই সময়ে ঋণ আদায়ও বেড়েছে।
এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ এবং শিল্প মেয়াদি ঋণেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। উৎপাদনমুখী খাতে অর্থায়ন অব্যাহত থাকলেও সামগ্রিক বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
খেলাপি ঋণ এখনও বড় ঝুঁকি
মার্চ ২০২৬ শেষে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও আগের প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে, তবুও এ হার এখনও অত্যন্ত বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর আদায়, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতে সংস্কারের বিকল্প নেই।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এটি কিছুটা উন্নতি হলেও উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অর্থনৈতিক সূচক বলছে, দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে। রেমিট্যান্স, রফতানি, রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে এসব খাতে কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপরই নির্ভর করবে সামনের সময়ের অগ্রগতি।