ঢাকা: মাত্র সাড়ে ২৯ বছরের জীবন আর এক বছরের কিছু বেশি সময়ের শাসনকাল। অথচ এই সংক্ষিপ্ত সময়েই শত শত বছর ধরে কোটি মানুষের হৃদয়ে আবেগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই লর্ড ক্লাইভ ও মীর জাফরের চক্রান্তে নির্মমভাবে শহিদ হন তিনি। পলাশীর আম্রকাননে তার পতনের পর থেকে আজ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও ট্রাজেডির অপর নাম সিরাজ। কিন্তু এই মহান বীরের পরবর্তী বংশধরদের জীবনের শেষ দিনগুলো কীভাবে কেটেছে?
সেই ইতিহাস সন্ধান করতে গেলে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষের অকৃতজ্ঞতা, সুচিকিৎসার চরম অভাব আর আমাদের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার এক নির্মম ও পঙ্কিল বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে। নবাবের ৮ম বংশধর, ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তফা এবং তার সহধর্মিণী মহীয়সী নারী সৈয়দা হোসনে আরা বেগমের জীবনের শেষ দিনগুলোর করুণ পরিণতি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার এক চাঞ্চল্যকর ও দুঃখজনক চিত্রকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
দুই হাসপাতালের অবহেলা ও একটি পরিবারের করুণ স্মৃতি
নবাবের নবম বংশধর আলি আব্বাসউদ্দৌলা তার আম্মিজান -এর মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজও চরম ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন। চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে কীভাবে একটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়, তার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, ২০০১ সালে ধানমন্ডির তৎকালীন ডক্টর সালাউদ্দিন হসপিটালে সুচিকিৎসার চরম অভাবে তার প্রাণপ্রিয় আম্মিজান সৈয়দা হোসনে আরা বেগম করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
শুধু মা-ই নন, তার বাবা নবাব সিরাজউদ্দৌলার অষ্টম বংশধর ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তফাকেও জীবনের শেষ সময়ে রাজধানীর অন্য একটি নামকরা হাসপাতালে চরম অবহেলার শিকার হতে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করার পরেও হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফদের কাছ থেকে ন্যূনতম মানবিক আচরণ পাওয়া যায়নি। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আলি আব্বাসউদ্দৌলা বলেন :
‘ইবনে সিনার মতো একটা হসপিটালে আমার আব্বা ভর্তি ছিলেন। সেখানে আমরা সম্পূর্ণ টাকা দেওয়ার পরও সুচিকিৎসা পাইনি। ডাক্তারদের ব্যবহার ভালো না, নার্সদের ব্যবহার ভালো না, এমনকি ওয়ার্ড বয়দের ব্যবহারও ভালো ছিল না। চিকিৎসকদের যেখানে দায়িত্ব রোগীর পরম যত্ন নেওয়া, সেখানে তাদের অবহেলা আমাদের স্তব্ধ করেছে। অথচ আমরা যখন প্রতিবেশী দেশ ইন্ডিয়াতে যাই, তখন সেখানকার ডাক্তার-নার্সদের ব্যবহার অনেক ভালো পাই। তারা নিজেদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ঠিক রেখেছে যাতে এদেশের রোগীরা সেখানে যায়, আর আমাদের দেশের কিছু মহলের চরম অবহেলা এবং শত্রু রাষ্ট্রের ইন্ধনে এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

নবাবের নবম বংশধর আলি আব্বাসউদ্দৌলা।
বাবার শেষ মুহূর্তের চিকিৎসার করুণ বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, তার আব্বাজানের জন্য প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্টের ব্যবস্থা পর্যন্ত করা হয়নি। তিনি যখন তার বাবাকে স্কয়ার হসপিটালে স্থানান্তর করতে চেয়েছিলেন, তখনো এক অদৃশ্য বাধায় তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। আব্বাসউদ্দৌলার প্রশ্ন ‘আমার আব্বার নিজের টাকায় চিকিৎসা হচ্ছিল, তাহলে নব্য সেট চন্দ্র বল্লভ জাফর ঘোষিটি ও দেশের সরকার/ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমস্যাটা কোথায় ছিল?’
বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল এবং বিচার ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই ঐতিহাসিক পরিবারটি বছরের পর বছর আইনি পদক্ষেপ নিতেও সাহস পায়নি। আব্বাসউদ্দৌলার মতে, ইউরোপ বা পারস্যের সিংহ খ্যাত ইরানের মতো দেশে এমন ঘটনা ঘটলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতো, কিন্তু বাংলাদেশে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য সুবিচার পাওয়া আকাশকুসুম কল্পনা।
তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকার বিভিন্ন সময়ে তাদের পরিবারকে নানাভাবে হেনস্তা ও উত্ত্যক্ত করেছে। এমনকি ২০১৬ থেক২০২৪ সালে তাঁর বাবার ওপর বারবার শারীরিক ও মানসিক ধকল গেছে, যার ফলে তিনি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি পরিবারকে চিকিৎসকদের এই অবহেলা এবং চারপাশের কিছু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে প্রতি গভীর আশা প্রকাশ করে নবাবের নবম বংশধর দেশপ্রেমী আব্বাসউদ্দৌলা বলেন :
‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্যার আছেন, যার গ্রহণযোগ্যতা দেশ-বিদেশে সর্বত্র। আমার বিশ্বাস, আমাদের এই ঐতিহাসিক পরিবারের ট্রাজেডির কথা জানতে পারলে তিনি অবশ্যই একটি রাষ্ট্রীয় অবস্থান নেবেন। তখন আমি এই সুচিকিৎসার অভাব ও অবহেলার বিচার প্রক্রিয়াটি সচল করতে পারব।’

ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ নুরুল হুদা ডিউক।
ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে নবাব পরিবার
নবাব সিরাজউদ্দৌলার অষ্টম বংশধর ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তফার সততা ও ব্যক্তিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন গবেষক ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ নুরুল হুদা ডিউক। তিনি বলেন,
‘নবাব সিরাজউদ্দৌলার ৮ম বংশধর ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তফা অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। নবাবদের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও দৃঢ়তা, তা তার মধ্যে পূর্ণমাত্রায় দেখা গেছে। তিনি কখনো কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। কিন্তু আমাদের দেশের এক চরম ব্যর্থতা হলো, মানুষ বেঁচে থাকতে আমরা তার মূল্যায়ন করি না, মরার পরে বড় বড় অনুষ্ঠান করি। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার প্রতি ইঞ্চি জায়গার প্রতীকী মালিক যে পরিবার, তাদের উত্তরসূরিরা আজ এই স্বাধীন দেশে সুচিকিৎসা পাচ্ছে না। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকদের আরও উদার হওয়া উচিত ছিল। এই পরিবারের খোঁজ না নিয়ে জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞতার পরিচয় দিচ্ছি।’
একই সুরে বিগত সরকারের উদাসীনতা ও ফ্যাসিবাদী আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ডক্টর রমিত আজাদ।
তিনি বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের এ দেশের মানুষের প্রতি কোনো ভালোবাসা ছিল না, যা আমরা তাদের শেষ সময়ে ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেখেছি। দেশের মানুষের প্রতি যাদের ভালোবাসা থাকে না, তাদের কাছে আমাদের প্রিয় নবাবের বংশধরদের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। জনাব ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা যখন গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর সুচিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো এই পরিবারটিকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চক্রান্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই ঐতিহাসিক পরিবারটিকে রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ডক্টর রমিত আজাদ।
পরিশেষ
পলাশী বিপর্যয় বা নবাবের শাহাদত দিবস আমাদের যেমন রাজনৈতিক সচেতনতার পাঠ দেয়, তেমনি নবাবের এই উত্তরসূরিদের জীবনের শেষ দিনগুলোর ট্রাজেডি আমাদের দেশের চিকিৎসকদের পেশাদারিত্ব এবং বড় বড় হাসপাতালের সেবার মান ও মানবিকতা নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ছুড়ে দেয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবার ঢাকার মাটিতেই আছেন, কোনো রাজপ্রাসাদে নয়, সাধারণ মানুষের কাতারে। কিন্তু চিকিৎসার মতো একটি মৌলিক ও মানবিক অধিকারের জায়গায় তাঁদের যে অবহেলার শিকার হতে হয়েছে, তা যেন আর কোনো নাগরিকের ক্ষেত্রে না ঘটে; নবাবের এই শাহাদত বার্ষিকীতে সেটাই হোক নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার।