Wednesday 01 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

১ জুলাই / যেভাবে রোপিত হয়েছিল ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’র বীজ

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১ জুলাই ২০২৬ ০৮:০৬ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২৬ ১০:২৫

জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ফাইল ছবি

ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব এক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের যে বীজ, তা মূলত রোপিত হয়েছিল ওই বছরের ১ জুলাই। দিনটি ছিল সোমবার। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষাঙ্গনগুলো ওইদিন একযোগে গর্জে উঠেছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে এদিন থেকেই দেশব্যাপী লাগাতার ও সুসংগঠিত আন্দোলনের সূচনা করেন, যা পরবর্তীতে ৩৬ দিনের এক টানা গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনের পটভূমি ও ৫ জুনের সেই রায়

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ছিল। ২০১৮ সালে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিল করে একটি পরিপত্র জারি করেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ সেই পরিপত্রটিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। ফলে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা পুনরায় বহাল হয়ে যায়।

হাইকোর্টের এই রায়ের পর পরই ৫ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাজপথে নেমে আসেন। এরপর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সরকারকে দাবি মানার জন্য ৩০ জুন পর্যন্ত একটি আলটিমেটাম বা সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ৯ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত পুরো মাসজুড়ে চলে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করার নেপথ্য কাজ। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়েও সরকারের পক্ষ থেকে কোটা সংস্কার বা বাতিলের কোনো কার্যকর ঘোষণা না আসায় ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় চূড়ান্ত ও সুসংগঠিত প্রতিরোধ।

একযোগে দেশের ১১টি স্থানে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ

১ জুলাই সকাল থেকেই দেশের অন্তত ১১টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে এবং আরও বেশ কয়েকটি স্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একযোগে বিক্ষোভ শুরু হয়। চাকরিপ্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার হাতে নিয়ে ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার চত্বরে সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী জমায়েত হতে থাকেন। সেখান থেকে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে কলাভবন, মল চত্বর, মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বসুনিয়া তোরণ ঘুরে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে শেষ হয়।

শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে তখন স্লোগান ছিল – ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘মেধার মান দাও, কোটার অবসান চাও’, ‘সমান সুযোগ, ন্যায্য অধিকার’, এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বাকের মজুমদার (যিনি বর্তমানে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক) জানান, জুন মাসের প্রস্তুতি শেষে ১ জুলাই দেশের সব বড় বড় শিক্ষাঙ্গনকে একসঙ্গে রাজপথে নামানোই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য, যা সফল হয়েছিল।

ঢাকার বাইরে উত্তাল দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও ১ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের তীব্র ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ক্যাম্পাসেই শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়ে রাজপথ অবরোধ করেন।
  • জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: জাবির শিক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারের পাদদেশে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এরপর একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা প্রতীকীভাবে ১০ মিনিটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
  • জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: জবির সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ছাত্র সমাবেশ করেন। পরে মিছিলটি রায়সাহেব বাজার মোড় ও বাহাদুর শাহ পার্ক প্রদক্ষিণ করে। শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
  • রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চারুকলার সামনে এবং প্রধান ক্যাম্পাসে দ্বিতীয় দিনের মতো মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চবি শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বৃষ্টির মধ্যেই সমাবেশ করে প্রশ্ন তোলেন, ‘যুদ্ধ হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তাহলে এখন কেন বৈষম্য?’
  • বাংলাদেশ কৃষি ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসজুড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গেটে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেন।

রাজু ভাস্কর্য থেকে শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবি ও কঠোর কর্মসূচি

১ জুলাই দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে চারটি মূল দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো-

  • ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সরকারি পরিপত্র বহাল রাখা।
  • একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে সরকারি চাকরির সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করা।
  • সংবিধান অনুযায়ী কেবল অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা ব্যবস্থা রাখা।
  • দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আইনি ও প্রশাসনিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা।

সমাবেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম (যিনি বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক) স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে কোটা সংস্কার প্রশ্নে আইনিভাবে চূড়ান্ত ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না এলে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি ২ জুলাই দেশব্যাপী মহাসড়কে মিছিল এবং ৩ ও ৪ জুলাই ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধসহ টানা তিন দিনের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

সরকারের উদাসীনতা ও ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য

১ জুলাই যখন দেশের তরুণ ও ছাত্রসমাজ কোটা বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাজপথে ঢল নামাচ্ছিল, তখন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিষয়টিকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি। প্রশাসনিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হলেও সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই আন্দোলনকে সাধারণ ছাত্রদের ক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করে অবহেলা করেছিলেন। উল্টো তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ব্যস্ত ছিল তাদের চিরাচরিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিকে নিয়ে সমালোচনা করতে।

১ জুলাই দুপুরে তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ অফিসে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শিক্ষার্থীদের এই বিশাল আন্দোলন নিয়ে কোনো কথা না বলে মন্তব্য করেছিলেন, “বিএনপির নেতাদের চোখে ঘুম নেই। তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। মির্জা ফখরুলের চোখে অশান্তির আগুন। লন্ডন থেকে ফরমান আসে ‘ইন অ্যান্ড আউট’।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সেদিনের সেই ছাত্র বিক্ষোভকে গুরুত্ব না দিয়ে ওবায়দুল কাদের ও তার দল যে রাজনৈতিক অহংকার দেখিয়েছিলেন, সেটাই শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১ জুলাইয়ের সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মাত্র ৩৬ দিনের মাথায় ওবায়দুল কাদেরসহ পুরো সরকারের শীর্ষ নেতাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।

ইতিহাসের পাতায় ১ জুলাই

২০২৪ সালের ১ জুলাইয়ের এই সুসংগঠিত আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের লড়াই ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল নৈতিক ও সামাজিক জাগরণ। শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিলেন যে তারা সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে কতটা সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ। রাষ্ট্র যখনই মেধার অবমূল্যায়ন করে কোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চায়, সমাজ যে তা দীর্ঘমেয়াদে মেনে নেয় না । ১ জুলাইয়ের ঘটনা ছিল তারই এক শক্তিশালী ও অমোঘ বার্তা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১ জুলাই তাই কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়, এটি একটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্র-জনতার অধিকার আদায়ের এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনার অবিচ্ছেদ্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

সারাবাংলা/এফএন/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর