Wednesday 24 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

এক ছাদের নিচে দুই দল: স্বামী ব্রাজিল আর স্ত্রী আর্জেন্টিনা!

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৪ জুন ২০২৬ ১৯:৩৩

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বাঙালির ড্রয়িংরুমে এক অলিখিত যুদ্ধক্ষেত্র। আর সেই যুদ্ধ যদি হয় লাতিন আমেরিকার দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে কেন্দ্র করে, তবে তো কথাই নেই! আমাদের সমাজে খুব চেনা আর নিয়মিত এক চিত্র হলো একই ছাদের নিচে, একই বিছানায় পিঠাপিঠি শুয়ে থাকা দুটি মানুষ ফুটবল মাঠে একে অপরের কট্টর শত্রু। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন; যখন স্বামী ব্রাজিল আর স্ত্রী আর্জেন্টিনার অন্ধ ভক্ত, তখন ম্যাচ ডে-তে ঘরের ভেতরের দৃশ্যপট কোনো হলিউড থ্রিলারের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর হয় না!

এই বিশেষ দিনগুলোতে সংসারের চেনা রুটিন এক ঝটকায় বদলে যায়। সকাল থেকেই বাতাসে ভাসতে থাকে এক অদ্ভুত শীতল যুদ্ধের আভাস। রান্নাবাড়ির মেন্যু থেকে শুরু করে বিকেলের চা চক্র, সবখানেই প্রচ্ছন্ন ছোঁয়া থাকে ফুটবলীয় দ্বৈরথের। স্বামী হয়তো আলতো করে মনে করিয়ে দেন, ‘আজ কিন্তু আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ বড্ড দুর্বল।’ ওপাশ থেকে স্ত্রীও চায়ের কাপে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা আভা খুঁজে নিয়ে পাল্টা জবাব দেন, ‘ব্রাজিলের ওই ফরোয়ার্ড তো এবার পেনাল্টি মিস করার রেকর্ড করবে!’

বিজ্ঞাপন

আসল খেলা তো জমে ওঠে মধ্যরাতে, যখন রেফারি বাঁশিতে ফুঁ দেন। সোফার ঠিক মাঝখান বরাবর যেন এক অদৃশ্য কাঁটাতারের সীমানা তৈরি হয়। একপাশে হলুদ জার্সি গায়ে স্বামী, অন্যপাশে আকাশি-সাদা জার্সিতে স্ত্রী। পুরো ৯০ মিনিট ধরে চলে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। ব্রাজিলের পাসিং মিসে স্ত্রী যখন মিটিমিটি হাসেন, স্বামীর তখন রক্তচাপ বাড়ে। আবার আর্জেন্টিনার কোনো খেলোয়াড় ফাউল করলে স্বামী সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করেন, ‘রেফারি, এটা নির্ঘাত লাল কার্ড!’ একে অপরের গোল মিসে হাততালি দেওয়া, আর গোল হলে পুরো বাড়ি মাথায় তোলা তো অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা।

তবে এই ফুটবলের লড়াই মাঝেমধ্যে রূপ নেয় মধুর মান-অভিমানেও। নিজের প্রিয় দল হেরে গেলে ঘরের আবহাওয়ায় যেন মেঘ জমে। যে দল হারে, সেই পক্ষের মানুষটি হয়তো খেলা শেষ হতেই মুখভার করে টিভির রিমোট ছুড়ে ফেলে সোজা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানোর ভান করেন। বিজয়ী পক্ষ তখন একটু বেশিই দয়াশীল হয়ে সান্ত্বনা দিতে যান, যা আসলে সান্ত্বনা নয়, বরং কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো শোনায়! অনেক সময় রাগ ভাঙাতে পরদিন পছন্দের রেস্তোরাঁয় ট্রিট কিংবা একটু বাড়তি খাতিরদারির প্রয়োজন পড়ে।

এক ছাদের নিচে এই লাতিন উত্তেজনা যেমন উপভোগ্য, তেমনি ঘরের শান্তি বজায় রাখতে ফুটবলপ্রেমী দম্পতিদের জন্য রইল কিছু জরুরি লাইফস্টাইল পরামর্শ:

যা করবেন…

যৌথ স্ন্যাক্স প্ল্যান: মধ্যরাতের ফুটবল আড্ডাকে জমজমাট করতে দুজনে মিলে আগেই চটজলদি কিছু স্ন্যাক্স বা কফি তৈরি করে রাখুন। এতে খেলার উত্তেজনার মাঝেও একটা সুন্দর টিমওয়ার্ক তৈরি হয়।

মজার বাজি ধরুন: খেলাকে আরও রোমাঞ্চকর করতে ছোটখাটো বাজি ধরতে পারেন। যেমন ‘যে দল হারবে, কাল সকালের নাস্তা সে বানাবে’ কিংবা ‘বিজয়ীর পছন্দের রেস্তোরাঁয় ডিনার ট্রিট দিতে হবে।’ এতে হারের বেদনাও ম্লান হয়ে যাবে আনন্দের কাছে।

খেলা শেষে জড়িয়ে ধরুন: রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর পর মাঠের শত্রুতা মাঠেই রেখে দিন। যে দলই জিতুক না কেন, বিজয়ী সঙ্গী যেন পরাজিত সঙ্গীকে একটি মিষ্টি হাসি বা জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেন। মনে রাখবেন, দলের চেয়ে লাইফ পার্টনার অনেক বেশি দামি।

যা করবেন না…

ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলুন: প্রিয় খেলোয়াড় বা দল নিয়ে ট্রোল করা ফুটবল সংস্কৃতির অংশ, কিন্তু তা যেন কখনোই সঙ্গীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, পরিবার বা অতীত নিয়ে কটূক্তিতে রূপ না নেয়। কথার সীমানা বজায় রাখুন।

খুনসুটিকে ঝগড়া বানাবেন না: সঙ্গী যদি হারের পর মন খারাপ করে চুপচাপ থাকে, তবে তাকে খোঁচানো বন্ধ করুন। সেই মুহূর্তে অতিরিক্ত খ্যাপাতে গেলে ঘরের পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে বড় ধরনের দাম্পত্য কলহ তৈরি হতে পারে।

বাচ্চাদের টেনে আনবেন না: নিজেদের ফুটবলীয় দ্বন্দ্বের মধ্যে সন্তানদের টেনে এনে ‘ও কার দলে’ তা নিয়ে জোরজুলুম করবেন না। সন্তানদের স্বাধীনভাবে খেলা উপভোগ করতে দিন।

দিনশেষে, মাঠের লড়াইয়ে যে দলই জিতুক বা হারুক, এক ছাদের নিচের এই ফুটবলীয় যুদ্ধটা আসলে ভালোবাসারই আরেক নাম। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের সমর্থক হয়েও এই যে একসঙ্গে বসে রাত জেগে খেলা দেখা, একে অপরকে খ্যাপানো, আর ম্যাচ শেষে মান-অভিমানের মিষ্টি খুনসুটি এগুলোই একঘেয়ে নাগরিক জীবনে এনে দেয় বাঁধভাঙা আনন্দ। ফুটবল মাঠের শত্রুতা ৯০ মিনিট পরই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু ড্রয়িংরুমের এই মধুর লাতিন যুদ্ধ সংসারকে করে তোলে আরও একটু রঙিন, আরও একটু প্রাণবন্ত!

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর