ঢাকা: মাত্র কয়েক মাস আগে অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহাযজ্ঞ শুরুর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশের সর্বোচ্চ এই সংস্থাটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী আগস্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের (প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ) তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবর থেকেই মাঠ পর্যায়ে ভোটগ্রহণ শুরু হতে পারে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে এরই মধ্যে আইন ও বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।
ইসির সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে কিছু সংশোধনী আনা হতে পারে। যেহেতু এবার নির্দলীয় নির্বাচন, সেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক সই সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হতে পারে। এটা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে। এ ছাড়া সহজ নিয়মের পাশাপাশি প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ এবং নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে।
আরও জানা গেছে, বর্তমানে চালু থাকা অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ও পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিধানটি বাতিল করা হতে পারে। সেই সঙ্গে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা নিয়মের পরিবর্তে এবার একটি ‘অভিন্ন আচরণ বিধিমালা’ তৈরি করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনি প্রচারে আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। অ্যানালগ পোস্টার নিষিদ্ধ করে বিলবোর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে নতুন কিছু বিধিনিষেধ যুক্ত করা হতে পারে।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে প্রার্থীদের হলফনামায় আচরণবিধি মেনে চলার ঘোষণাপত্রে আলাদা কোনো অঙ্গীকারনামা থাকবে না। হলফনামার ফরমের সঙ্গে একটা ঘোষণাপত্র থাকবে। প্রার্থী আচরণবিধি মেনে চলবেন- ঘোষণাপত্রে এমন একটি লাইন যুক্ত হবে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখেই স্থানীয় সরকারের এই আইন ও বিধানগুলো সংস্কার করা হবে। বরাবরের মতো এবারও স্থানীয় নির্বাচনে আইন শৃঙ্খলায় সেনাবাহিনীকে না রাখার কথাই ভাবা হচ্ছে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে এরই মধ্যে উপজেলা পরিষদ ভবনে সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বিশেষ ‘পরিদর্শন কক্ষ’ প্রস্তুতের নির্দেশনা দিয়েছে। ভোটের সময় এমপিদের কক্ষ কোনো ধরনের প্রচার কাজে যেন ব্যবহার না হয় এবং সেখানে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’কে ভোটের সময় নিষ্ক্রিয় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে ইসির। পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কোনো সংলাপ না করে নতুন পরিবর্তিত বিধিগুলো শুধু ওয়েবসাইটে খসড়া প্রকাশ করার পরিকল্পনা করছে সংস্থাটি।
ইসি সূত্রে আরও জানা গেছে, বর্ষা মৌসুম শেষেই ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হবে। এর পর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। জানা গেছে, এবার বিভাগভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ সারাবাংলাকে জানান, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে। তবে বাস্তবতার নিরিখে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচন একসঙ্গেও হতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদাধিকারবলে (এক্স অফিসিও) উপজেলা পরিষদের সদস্য। তাই নিয়ম অনুযায়ী আগে ইউপি নির্বাচন না করলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচন যেকোনো সময় করা যাবে এবং জেলা পরিষদ নির্বাচন হবে সবার শেষে।’
ইসি বলেন, ‘আমরা বিভাগভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা ভাবছি। কারণ, সারা দেশে একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন করতে পারলে একটি বিভাগে নির্বাচন আয়োজন করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। আমাদের সব পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন বর্তমানে জনপ্রতিনিধিশূন্য। জেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচন হয় না। তাই এই তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন যেকোনো সময় আয়োজন করা সম্ভব।’
এ ছাড়া তিনি জানান, আইন ও বিধি সংশোধনের কাজ চলছে। প্রস্তাবিত বিধিগুলো জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এর পর নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে, অক্টোবরে ভোটকে সামনে রেখে তফসিল ঘোষণা হতে পারে আগস্টে।
নতুন বিধি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকারের ভোটে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তাকে স্বাগত জানিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষক আব্দুল আলীম। প্রস্তাবিত বিধি নিয়ে সারাবাংলার সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষায় কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবটি সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য।’
তিনি বলেন, ‘একযোগে পুরো দেশে সংসদ নির্বাচন করাটা বেশ জটিল। কারণ, সেখানে বিপুল পরিমাণ নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েন করতে হয়। বিপরীতে, স্থানীয় ভোট যেহেতু দফায় দফায় সম্পন্ন হয়, তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসংকট তেমন একটা হয় না। ফলে, এই ভোটে সেনাসদস্যদের ডাকার দরকার পড়ে না।’
আবার সংলাপ বাদ দিয়ে ইসি’র একতরফা সংস্কার একনায়কতান্ত্রিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন আব্দুল আলীম। তার মতে, ‘নতুন বিধিগুলো শুধু ওয়েবসাইটে খসড়া প্রকাশ করে দায় এড়ানো যায় না। মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাই ভালো বোঝেন। তাই সংশ্লিষ্টরাও যেন নতুন বিধিগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে এবং বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে বর্তমান কমিশন একটি সংঘাতহীন ভোট উপহার দিতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই বিশ্লেষক।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইসির সামগ্রিক ভূমিকা, সংলাপহীন সংস্কার এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার হলো গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর। এই স্তরের নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তাড়াহুড়ো না করে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই স্থানীয় নির্বাচন করা উচিত। সেই সঙ্গে সাংবিধানিক আইন, বাস্তবতা ও সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’
বর্তমান মাঠচিত্র ও পরিসংখ্যান
ইসির তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে ৪ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি ইউপি । আর আইনি জটিলতার কারণে আটকে আছে ৪৭৭টি। এ ছাড়া ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভেঙে দেওয়া হয় ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১টি জেলা পরিষদ। বর্তমানে সেগুলো সরকারি প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যা এখন সম্পূর্ণ নির্বাচন উপযোগী। আর সম্প্রতি সরকার বগুড়াকে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন হিসেবে অনুমোদন দেওয়ায় এবং নতুন পাঁচটি উপজেলা (মোকামতলা, মাতামুহুরী, রুহিয়া, ভুল্লী ও চন্দ্রগঞ্জ) গঠন করায় দেশে মোট উপজেলার সংখ্যা এখন ৫০০টি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো একধরনের ধোঁয়াশা থাকলেও, ইসির এই কর্মপরিকল্পনা তৃণমূলের রাজনীতিতে নতুন করে হাওয়া দিতে শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিতর্কের মুখে থাকা বিধিমালাগুলো পুনর্বিবেচনা না করলে এই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।