ঢাকা: প্রতিবছর নিয়মিত দেশি-বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হলেও বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঋণ বাড়ছেই। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি পঞ্জিকা বছরের গত মার্চ শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত (অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি) ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫৯ হাজার ১০১ কোটি টাকা। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের স্থিতি ছিল ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। সে হিসাবে চলতি পঞ্জিকা বছরের গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তিন মাসে সরকারের মোট ঋণ বেড়েছে ৫২ হাজার ৬৩৯ কোটি টাকা।
অতি সম্প্রতি এ হিসাব চূড়ান্ত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব মতে, সরকারের মোট পুঞ্জিভূত ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১২ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা। এটি মোট পুঞ্জিভূত ঋণের ৪৩ শতাংশ।
সরকারের পুঞ্জিভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের গৃহীত ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এর পরিমাণ ৮ লাখ ৮১ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ট্রেজারি বন্ড ও এসপিটিবি থেকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ২৮ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৬৮ শতাংশ); ট্রেজারি বিল থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা; কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা এবং ‘সুকুক’ থেকে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে সরকারের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ২৬ শতাংশ) এবং অন্যান্য (জিপিএফ) খাত থেকে ৮১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা (মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৬ শতাংশ) নেওয়া হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণের হিসাবে পার্থক্য
সরকারের পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে বিগত সময়ের মত এখনও বড় ধরনের পার্থক্য বিদ্যমান। পার্থক্যের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা (প্রায় ১ হাজার ২৫৬ কোটি ডলার)।
অর্থ বিভাগ-এর হিসাব অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর হিসাব মতে, গত মার্চ শেষে সরকারের মোট পুঞ্জিভূত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি হচ্ছে ৯ হাজার ৯১ কোটি ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ১৮ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এটি অর্থ বিভাগ-এর পরিসংখ্যানের তুলনায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগ-এর মতে, সরকারের ঋণ বাড়লেও এটি এখনো ঝুঁকিসীমার নীচে রয়েছে। বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণ ঝুঁকির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। তবে ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণ-রফতানি অনুপাত ১৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
পুঞ্জিভূত ঋণস্থিতির বাইরে সার্বভৌম ব্যাংক গ্যারান্টি
অর্থ বিভাগ বলছে, সরকারের এ পুঞ্জিভূত ঋণ হিসাবের বাইরে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের দেশি-বিদেশি গৃহীত ঋণের বিপরীতে সরকার প্রদত্ত সার্বভৌম গ্যারান্টি বা দায় রয়েছে। গত মার্চ শেষে এ ধরনের গ্যারান্টির স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টির পরিমাণ ৪৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।