ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় নির্বাচনি কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ) নির্বাচনের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের সমান, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার (প্রস্তাবিত ২,৯০০ কোটি টাকা) বাজেট বরাদ্দ চেয়েছে ইসি।
কমিশন আগামী আগস্টে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নিচ্ছে। প্রায় বছরব্যাপী অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনে বাজেট, অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবরের মতোই কাটছাঁটের চেষ্টা করলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায়, নির্বাচন কর্মকর্তাদের দাবি, সারাদেশে একসঙ্গে তৃণমূলের ভোট করতে গেলে এই বরাদ্দের কোনো বিকল্প নেই।
বিশাল এই বাজেটের ব্যয়ের হিসাব
ইসি সচিবালয়ের বাজেট ও অর্থ শাখার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত হতে যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। কারণ, এই দুটি স্তরেই সারা দেশের সব অঞ্চলের কোটি কোটি ভোটার সরাসরি ভোট দেন।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (বাজেট ও অর্থ) মো. শামসুল হক ফৌজদার জানান, সারাদেশে ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদের ভোট করতে হয়। এ কারণে এই দুই ভোটের ব্যয় বরাদ্দ প্রায় সমান সমান থাকে। সাধারণত ইউপিতে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় ধরা হয়ে থাকে এবং উপজেলাতেও দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। নির্বাচনি সরঞ্জামের দামের ওপর ভিত্তি করে এই ব্যয় কিছুটা কমবেশি হয়ে থাকে। সেই তুলনায় ৩৩০টি পৌরসভা, ১৩টি সিটি করপোরেশন এবং ৬১টি জেলা পরিষদে খরচ অনেক কম। প্রতিটি সিটি করপোরেশনে ভোটার সংখ্যা অনুপাতে ২০ থেকে ৩৫ কোটি টাকা এবং পৌরসভা ও জেলা পরিষদে এর চেয়েও কম ব্যয় হয়ে থাকে।
সংসদ নির্বাচনের ‘উদ্বৃত্ত’ অর্থ ও সাশ্রয়
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসুর মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন।
সংসদ নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সোয়া দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বেঁচে গেছে। এই তথ্য উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ অর্থ সাশ্রয়ের নতুন বার্তা দিয়েছেন।
সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ৩০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৮০ কোটি টাকার মতো এখনো অব্যয়িত রয়ে গেছে। তিনি আরো জানান, বাড়তি কোনো কিছু খরচ করা হচ্ছে না, উল সাশ্রয় করা হয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনেও চাহিদা মতো বরাদ্দ থাকবে বলে আশার কথা জানান তিনি। বলেন, যখন যে নির্বাচন হবে সে অনুযায়ী অর্থ সংকুলান ও ব্যয় করা হবে।”
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের অধীনে এই স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে তাদের জনপ্রিয়তা ও মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রথম বড় পরীক্ষা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, স্থানীয় সরকারের ৪,৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ৪৯৫টি উপজেলার ভোটে একক কোনো সংসদ নির্বাচনের চেয়ে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক বেশি জটিল। তাই নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। বিশেষ করে পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেছনেই নির্বাচনী বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়।
শেষ পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয় ইসির প্রস্তাবিত ২,৯০০ কোটি টাকা থেকে বাজেট কতটা কাটছাঁট করে এবং ইসি কীভাবে সেইটা সামাল দেয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।