রংপুর: ২০ জুনের নির্ধারিত সময়ের আগেই রংপুরের বিখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমে বাজার সয়লাব। অপরিপক্ব এসব আম ক্যালসিয়াম কার্বাইডের বা স্থানীয়ভাবে (‘পানি মারা’) বিষাক্ত ছোঁয়ায় পাকিয়ে বিক্রি করায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। স্বাদহীন এসব ‘কৃত্রিম’ ফলে যেমন বাড়ছে ক্যানসার ও কিডনি রোগের ঝুঁকি, তেমনি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত এই জিআই পণ্যের সুনাম।
জানা গেছে, রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জের বাগান থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা অপরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকিয়ে নগরীর সিটি বাজার, লালবাগ, গনেশপুর ও বাস টার্মিনাল এলাকায় বিক্রি করছেন একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। কৃষি বিভাগ ও জেলা প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ২০ জুনের আগে এই জাতের আম পরিপক্ব হয় না। কিন্তু কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করে বিপণন করা হচ্ছে বিষাক্ত এসব ফল।
সিটি বাজারের ক্রেতা ফয়সাল আহমেদ অভিযোগ করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকে বলেন, ‘হাঁড়িভাঙা আম পাকা ভেবে কিনেছিলাম। বাড়িতে নিয়ে কেটে দেখি খুব টক, ভেতরে কাঁচাভাব রয়ে গেছে। আম কাটলেই বোঝা যাচ্ছে তা কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে।’
রংপুরের বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, প্রয়োজনে ইথিলিন ব্যবহার করা যেতে পারে, যা তেমন ক্ষতিকর নয়। তবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড অত্যন্ত ক্ষতিকর—এটি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় ও কিডনি নষ্ট করতে পারে।
জানা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী গ্রামে নফল উদ্দিন পাইকারের হাত ধরে এই জাতের আমের উৎপত্তি। একদিন রাতে কেউ আমগাছের নিচে রাখা পানির হাঁড়ি ভাঙিয়ে দিলে পরবর্তীকালে সেই গাছের আম ‘হাড়িভাঙ্গা’ নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে মাতৃগাছটির বয়স ৬৩ বছর।
আঁশবিহীন, সুঠাম ও মাংসালো এই আম দেখতে কিছুটা লম্বাটে ও গোলাকৃতির। পাকলে লালচে আভা ধারণ করে। চামড়া কুচকে গেলেও পচে না—এটি এর অন্যতম বিশেষত্ব। এক একটি আমের ওজন ২০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়।
মিঠাপুকুরের বড় চাষি মাহফুজার রহমান ও হাঁড়িভাঙা আম চাষি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম বাবলু অভিযোগ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘অপরিপক্ব আম কৃত্রিম উপায়ে পাকিয়ে বিপণন করায় হাঁড়িভাঙার স্বাদ ও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের সুনাম নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন প্রকৃত চাষিরা।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, ২০ জুনের আগে আম সংগ্রহের অনুমতি নেই। কৃত্রিম পদ্ধতিতে পাকালে মান ও স্বাদ নষ্ট হয়, জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় তিন হাজার ৩৩৫ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৯০৫ হেক্টরে হাঁড়িভাঙার বাগান। এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৯ হাজার ৭১০ টন।
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃত এই আম বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক। আগাম বাজারে কৃত্রিম পাকানো আম বিক্রি এই সম্ভাবনাকেই বড় আঘাত করছে।