রংপুর: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীদের গুলিতে ছয় জন নিহত হন। সেই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। কিন্তু এই ছয়টি মামলার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেনি পুলিশ। অন্যদিকে, এসব মামলাকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ ও ‘এফিডেভিট বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে, যা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মামলার অগ্রগতিতে এমন স্থবিরতা ও জটিলতার মধ্যে নিহতদের স্বজনরা, আইনজীবী ও আন্দোলনকারীরা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কেন দুই বছরেও প্রকাশ্যে গুলি চালানো অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কেন মামলার বাদীদের ‘এফিডেভিট’ দিয়ে আসামিদের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা চলছে।
মামলার প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের দিন রংপুরের টাউন হল এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। এতে ছয় জন নিহত হন। তারা হলেন- কলাব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম, শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির, ব্যবসায়ী সাজ্জাদ হোসেন, জুয়েলার্স কর্মচারী মোসলেম উদ্দিন, যুবক মাহমুদুল হক মুন্না এবং অটোচালক মানিক মিয়া।
ওই দিন রংপুরে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ১০ জন সশস্ত্র নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজে তাদের অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও, দুই বছরেও তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে ছয়টি মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ নেতা, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশের সাবেক ডিআইজি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, সহকারী কমিশনার, ওসি, এসআইসহ শতাধিক কর্মকর্তা-আসামি হয়েছেন। যদিও এসব কর্মকর্তা ও নেতাদের অনেকে মামলার বাদীকে ‘ম্যানেজ’ করে আদালতে এফিডেভিট করিয়ে নিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে- ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই।
বাদীদের একাংশ আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে জানিয়েছেন, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, উপ-কমিশনার, সহকারী কমিশনারদের নাম তারা মামলা দায়েরের সময় দেননি। পরে জানতে পেরে তারা বুঝতে পারেন, এসব কর্মকর্তা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। নিহত কলা ব্যবসায়ী মেরাজুলের মা আম্বিয়া বেগম জানান, কয়েকজন আইনজীবী তার বাসায় এসে মামলা করতে বলেন। তিনি জানেন না মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে। তিনি শুনেছেন, ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের কাউকেই তিনি চেনেন না।
শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আবদুর রহমান মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা আসামি রেখেছেন আরও ২০০ থেকে ৩০০ জন। ব্যবসায়ী সাজ্জাদের স্ত্রী জিতু বেগম ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা আসামি রেখেছেন ৩০০ জন।
কর্মচারী মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা বেগম ১৭ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা বহু আসামির কথা উল্লেখ করেছেন। যুবক মাহমুদুল হক মুন্নার বাবা আবদুল মজিদ ১২৮ জনের নাম এবং অটোচালক মানিকের মা নুরজাহান বেগম ১১৯ জনের নাম উল্লেখ করেছেন।
বাদীরা স্বীকার করেছেন যে, তারা জানেন না কাদের আসামি করা হয়েছে। তাদের অনেককে এফিডেভিট করতে বলা হয়েছে, যেখানে আসামিদের ঘটনার সময় উপস্থিত না থাকার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবীদের অভিমত
রংপুরের সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা সারাবাংলাকে বলেন, “মামলা দায়েরের পর ‘চিনি না, আসামি করিনি’ বলে এফিডেভিট করলে আইনগত কোনো মূল্য নেই। তবে এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়।” তিনি বলেন, ‘এভাবে মামলার নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। অনেক নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চার্জশিট দাখিল করলেও বিচারের সময় বাদীরা সাক্ষ্য দেবেন না, ফলে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হবে।’
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগরের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিহতদের মামলায় ৮০ শতাংশ আসামি নিরপরাধ।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘ছয়টি হত্যা মামলার আসামি কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়নি, অথচ তারাই গুলি করেছে, হুকুম দিয়েছে ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন রক্ষায় কাজ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীতে এখনো ফ্যাসিস্টদের দোসর রয়েছে।’
তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য
রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী সারাবাংলাকে জানান, মামলায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এক পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি পেয়েছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘তবে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের অনুমতি এখনো পাওয়া যায়নি। আশা করছি দ্রুত পাব। অনুমোদন পেলে আগামী এক মাসের মধ্যে চার্জশিট দাখিল সম্ভব হবে।’ বাদীদের এফিডেভিটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসবের আইনগত কোনো মূল্য নেই।’
অস্ত্রধারীদের শনাক্তকরণে ব্যর্থতা
ঘটনার দিন আওয়ামী অস্ত্রধারীদের গুলি চালানোর কয়েকটি ছবি সে সময় ভাইরাল হয়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, হেলমেট পরা দু’জন অস্ত্রধারী পিস্তল হাতে আন্দোলকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা অন্যদের হাতেও ছিল দেশীয় অস্ত্র। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, সেদিন অন্তত ১০ জন অস্ত্রধারী গুলি চালিয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর পরিচালিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে ওই ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, ৩ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে নগরীর টাউন হল এলাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়। সেদিন টাউন হল থেকে বের হওয়া একটি মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ওই দিন পুলিশ সদস্যরা বলপ্রয়োগ না করে তাদের কাছ থেকে ফুল গ্রহণ করেন।
৪ আগস্ট সকাল থেকেই সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে টাউন হল এলাকায় ছাত্র-জনতার ঢল নামে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশ টাউন হল এলাকা ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। তারা সড়ক অবরোধ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
একই সময়ে নগরীর দেওয়ানবাড়ী এলাকায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। তারা পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও সুপার মার্কেট এলাকায় সশস্ত্র অবস্থান নেন।
পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ
আন্দোলনকারীরা জানায়, আন্দোলনে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে আওয়ামী লীগ চাপে পড়ে আন্দোলনকারীদের রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে হামলার পরিকল্পনা করে। রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নগরীতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেওয়া, অস্ত্র সরবরাহ এবং হামলায় অংশ নেওয়ার দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তারা।
যুবলীগ সূত্রে জানা যায়, ৩ আগস্ট রাতে ছাত্রদের আন্দোলন মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনা করা হয়। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নগরীতে আসতে বলা হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংরক্ষিত নারী আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নাসিমা জামান ববি, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রনি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী তুহিন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তৌহিদুল ইসলাম সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
দুপুর ১২টার দিকে নগরীর সুপার মার্কেট এলাকার দিক থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার সমাবেশের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। তাদের কয়েকজন জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টার মার্কেটের সামনে পৌঁছানোর পর বিক্ষোভস্থলে অগ্রসর হতে হতে গুলি ছুড়তে শুরু করেন। এতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা পিছু হটেন। এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা পালটা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের পালটা ধাওয়ায় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা পালিয়ে যান। পরে আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
পালিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীরা
ঘটনার পর পরই রংপুর ছেড়ে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী। বাকিরা পরদিন হাসিনার পতনের পর এলাকা ছাড়েন। ঘটনার দুই বছরেও অস্ত্রধারীরা এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যা বলছেন
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর জেলার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘চিহ্নিত অস্ত্রধারীরা গ্রেফতার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে পুলিশের আগ্রহ নেই। এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি দেখছি না।’
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দুই বছরেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শনাক্ত করতে পারেনি, এটি দুঃখজনক ঘটনা। এ ঘটনায় পুলিশ ও অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির প্রতিফলন ঘটেছে।’
পুলিশ যা বলছে
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনার পর অভিযুক্ত অস্ত্রধারীরা আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছেড়েও পালিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম চলছে। ছাত্র-জনতার ওপর যারা গুলি চালিয়েছে তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
আইনি বিশ্লেষণ
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাদীদের এফিডেভিটের মাধ্যমে আসামিদের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা আইনগতভাবে বৈধ নয়। তবে এতে মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ব্যহত হচ্ছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে দুই বছরেও অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, যাদের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে এবং প্রত্যক্ষদর্শী রয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, রংপুরের জুলাই হত্যা মামলার দুই বছর পূর্ণ হতে চললেও ন্যায়বিচার এখনও দূরবর্তী। নিহতদের স্বজনরা, আন্দোলনকারীরা এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মামলায় এফিডেভিট বাণিজ্য ও আসামিদের নাম প্রত্যাহারের চেষ্টা ন্যায়বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। সঠিক তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা উদঘাটন এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল।