Thursday 20 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

তিস্তার তীর রক্ষা প্রকল্প / ২১০ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ, চলছে নিম্নমানের কাজ

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৫ জুন ২০২৬ ০৯:২০ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ ১০:৪৫

তিস্তার তীর রক্ষা প্রকল্প। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় তিস্তা নদীর তীর রক্ষায় নেওয়া প্রকল্পে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার ও বিপুল অঙ্কের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দরপত্রের শর্ত উপেক্ষা করে জিও ব্যাগে বালুর পরিবর্তে নদীর কাদামাটি ভরাট, নির্ধারিত সিমেন্টের পরিমাণ না মানা এবং নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রায় ২১০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। জুন মাসে বরাদ্দের সময় শেষ হওয়ায় দ্রুত কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদাররা অর্থ তুলে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ তাদের।

তিস্তা ব্রিজ এলাকায় কাজের ধুম পড়ে গেলেও আপাতদৃষ্টিতে বাস্তবে চলছে চরম ফাঁকি। দরপত্র অনুযায়ী ছয় বস্তা বালুর সঙ্গে এক বস্তা সিমেন্ট মেশানোর নিয়ম না মেনে নদী থেকে তোলা কাদামাটি দিয়ে জিও ব্যাগ ভর্তি করছেন ঠিকাদাররা। বস্তা গণনা না করেই নদীর তীরে ডাম্পিং করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পে নানা অনিয়ম

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকরা নির্ধারিত নিয়ম না মেনে নদীর পাড় থেকে তোলা কাদামাটি দিয়েই জিও ব্যাগ ভর্তি করছেন। হয়রানির ভয়ে নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক শ্রমিক বলেন, ‘বালু আনা হয় খুব কম, বেশি তো কাদামাটি। ঊর্ধ্বতনরা বলেছে, কাদামাটি দিয়েই ভরতে।’

তিনটি প্রকল্প ঘুরে বালাপাড়ায় পাওয়া যায় রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যসহায়ক খোকন দাসকে। তিনি কাজের কোনো ফিরিস্তি বলতে পারেননি। তার দাবি, ‘প্রতিদিন বালু নিয়ে আসা হয়।’ কিন্তু ঘটনাস্থলে সেটার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের মূল ঠিকাদার অতি লাভের আশায় কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন অন্য ঠিকাদারকে। সেই ঠিকাদারও আবার বিক্রি করে দিয়েছেন অন্য আরেকজনের কাছে। এমন ঘূর্ণায়মান দায়িত্ব হস্তান্তরের কারণে কাজের মান তলানিতে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ।

ঠিকাদার লাভলু মিয়া দরপত্র অনুযায়ী ছয় বস্তা বালুর সাথে এক বস্তা সিমেন্ট মেশানোর নিয়ম তোয়াক্কা না করে ১২ বস্তা বালুর সঙ্গে দেড় বস্তা সিমেন্ট মেশাচ্ছেন। তিনি সারাবাংলাকে, ‘আমাকে এভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

কিন্তু তার এই দাবি নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘জিও ব্যাগে কাদামাটি ব্যবহারের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বালু-সিমেন্টের অনুপাত নিয়ম অনুযায়ী না হলে তীর স্থায়িত্ব পাবে না। বর্ষার স্রোতে এগুলো ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।’

তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা যা বলছেন

তিস্তাপাড়ের বাসিন্দা আক্কাশ মিয়া (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাস্তবায়ন তো আর সঠিক হবে না। তিস্তার স্রোতে এগুলো যখন তখন ভেসে যাবে। আমরা নিজ চোখে দেখছি কাদামাটি ভর্তি করছে। আর এই টাকা লুটের কী হবে? এভাবে চলতে দেব না আমরা।’

আরেক বাসিন্দা মনোয়ার আলী (৪৮) সারাবাংলাকে বলেন, ‘এমন কাজ বেশি দিন টিকবে না। হয়তো দুই পাঁচ দিন টিকবে, এরপর পঁচে ভেসে নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। আমাদের প্রাণের তিস্তা রক্ষার নামে লুটপাট চলছে। যারা এদের ঠিকাদারি দিচ্ছে, তারাও কম দায়ী নয়।’

গৃহিণী রওশনারা বেগম (৪০) সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্ষায় তো আমাদের ঘরবাড়ি ভেসে যায়। এবারও মনে হচ্ছে একই অবস্থা হবে। আমাদের এলাকার মানুষ এভাবে ঠকবে কেন? সরকারি টাকায় যদি এত বড় লুটপাট হয়, তাহলে তো কোনো কিছুই ঠিক থাকবে না।’

চরপাড়ের যুবক জাকির হোসেন (৩০) বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন হয়তো নিয়মিত আসে, কিন্তু তারা কিছু দেখতে চায় না। ঊর্ধ্বতনদের খুশি করতে স্মার্টফোনে ছবি তুলে যায়। মাঠে নেমে কাজের মান দেখে না।’

যা বলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জিও ব্যাগে বালুর পরিবর্তে কাদামাটি ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও কাজের নিম্নমানের কথা অস্বীকার করেছেন। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু কাজ শেষ হয়ে গেছে। সেখানে হয়তো পরিষ্কার চলছে, সেটা ঠিকাদার করছে। কিন্তু ফাইনালি টেস্ট রিকোয়ারমেন্ট ফুলফিল না হওয়া পর্যন্ত সে ফাইনাল বিল পাবে না।’

তদারকির নামে গাফিলতি

কাজের মান ও শঙ্কা তদারকির দায়িত্ব থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে তেমন উপস্থিতি নেই বলেই অভিযোগ। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের বিকল্প নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, জনবল সংকটের অজুহাতে তদারকি ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’

তিনি বলেন, ‘জিও ব্যাগ, বালি ও সিমেন্টের সঠিক অনুপাত বজায় না রাখলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইঞ্জিনিয়ারদের প্রকল্পস্থলে গিয়ে কাজের গুণগত মান পরীক্ষা করার কোনো বিকল্প নেই।’

ত্রাণমন্ত্রী যা বলেছেন

নামকাওয়াস্তে নিম্নমানের উপাদান দিয়ে নদীর তীর রক্ষার নামে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া এসব প্রকল্পের বিরোধিতা করেছিলেন বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। সম্প্রতি রংপুর সফরে এসে সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই প্রকল্পগুলো তো গত সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছে। নতুন করে তিস্তার বুকে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণের সময় আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা আশা করি, ওই ধরনের আর কোনো বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নেওয়া হবে না।’

প্রকল্পের আওতায় পাঁচ জেলায় কাজ হলেও কোন জেলায় কতটুকু অগ্রগতি, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদর দফতরে যোগাযোগ করলে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি এই সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি আমরা। দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা যাচাইয়ে সময় লাগবে।’

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তিস্তার স্রোত অত্যন্ত প্রবল। এখানে নিম্নমানের জিও ব্যাগ ও কাদামাটি ব্যবহারের অর্থ প্রকল্পের স্থায়িত্ব কার্যত শূন্য। এছাড়া বালি-সিমেন্টের অনুপাত পরিবর্তন করলে ব্যাগের দীর্ঘস্থায়িত্ব কমে যায়। মাত্র এক বর্ষা মৌসুমেই প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ বিলীন হয়ে যেতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডের উচিত প্রতিটি জিও ব্যাগের উপাদান পরীক্ষা করা। এলোমেলো ডাম্পিং নয়, নির্দিষ্ট মান অনুযায়ী ডিজাইন প্রণয়ন করা জরুরি।’

বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি

তিস্তা নদী সহজাতভাবে অত্যন্ত অস্থির। প্রতি বর্ষায় ভাঙন ও বন্যা প্রকট আকার ধারণ করে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ই-লার্নিং সেন্টারের উপ-পরিচালক মাসুদার রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই তিস্তায় ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। এই প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ চললে আগামী বছরগুলোতে বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। এতে তীরবর্তী মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।’

স্থানীয়দের দাবি

তিস্তাপাড়ের বাসিন্দারা প্রকল্পের কাজের গুণগত মান নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। নুরুল ইসলাম (৬০) বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই তিস্তার ভাঙনে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এবার যদি টাকা দিয়ে লুটপাট হয়, তাহলে তো আরও বিপদ। সরকারের কাছে দাবি, যেন কাজ ঠিকমতো হয়। আর যারা লুটপাট করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’

স্থানীয় সাংবাদিক রুহুল আমিন জানান, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম হওয়ার খবরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। একটি স্বাধীন তদন্ত দল পাঠানোর দাবি উঠেছে।’

সমন্বিত উদ্যোগের অভাব

তিস্তার সামগ্রিক উন্নয়নে একক প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিস্তার সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। খণ্ড খণ্ড প্রকল্প দিয়ে তিস্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এখানে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগেও ভাবতে হবে।’

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। এরই মধ্যে ঠিকাদাররা বেশিরভাগ কাজ শেষ দেখিয়েছেন এবং অর্থ তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে— মানহীন কাজের দায় কে নেবে? নদী ভাঙনে কি আরও প্রাণহানি বা সম্পদহানির ঘটনা ঘটবে? দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা হাইকোর্ট কি এই অনিয়মের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ব্যবস্থা নেবে?’

উপ-পরিচালক মাসুদার বলেন, ‘বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। তিস্তা তীরবর্তী লক্ষাধিক মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভর করছে তীর রক্ষা প্রকল্পের ওপর। অথচ সেখানেই নিম্নমানের কাজ ও অর্থ লুটপাটের অভিযোগ স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়— প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয় কি না।’

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর