Saturday 13 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুর / ‘চনচনা অইদোত গাওত ফোসকা পড়ি গেইচে’

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ জুন ২০২৬ ০৮:১৫ | আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ ১০:৩৯

জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুরের জনজীবন। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে যখন গোটা জনপদ পুড়ে যাচ্ছে, তখন সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন রংপুরের প্রায় দুই লাখ কৃষি ও দিনমজুর শ্রমিক। কাজের অভাবে পেটের দাবি মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। আর যারা কাজ পাচ্ছেন, তাদের কপালে জুটছে মাত্র ৪০০ টাকা মজুরি, তাও আবার অসহ্য গরমে দিশেহারা হয়ে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ ও অর্থনৈতিক সংকটের দোলাচলে রংপুরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন শুধু টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা বলয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

যে কারণে বাড়ছে দুর্ভোগ

বিজ্ঞাপন

বোরো ধান কাটা-মাড়াই শেষ হলেও আমন ধানের চারা রোপণ শুরু হতে এখনও সময় আছে। ফলে ফসলের মাঠ অলস পড়ে আছে, আর এই ফাঁকে কৃষি শ্রমিকদের কাজ নেই। তার ওপর গত কয়েকদিন ধরে রংপুর অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) দিনাজপুরে এ মৌসুমের সর্বোচ্চ ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, এই তীব্র তাপপ্রবাহ আরও কয়েকদিন বজায় থাকতে পারে।

এদিকে শুধু তাপমাত্রাই নয়, আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অস্বস্তি কয়েকগুণ বেড়েছে। এ অবস্থায় খোলামাঠে কিংবা রোদে কাজ করা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

ক্ষেতে-নগরে হাহাকার

রংপুর নগরীর হোসেনপুর এলাকায় কাজ ফেলে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেন পঞ্চাশোর্ধ কৃষি শ্রমিক হানিফ আলী। শরীর বেয়ে ঘাম ঝরছে, কণ্ঠে শুধু হাহাকার, ‘মন্নের (মরণের) গরমে মরি গেইনো বাহে। চনচনা অইদোত (কড়া রোদে) হামার গাওত ফোসকা পড়ি গেইচে। ইয়াতে কী আর কাম করা যায়!’

মিরাজ আলী নামের আরেক শ্রমিক বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ তুলে ধরে বলেন, ‘কাম না করলে হামার পেটোত ভাত চইরবার নয়, না খ্যায়া থাকা নাগবে। ফির এমন অইদ আর গরমে কাম করলে হামার জীবনে বাইচপার নয়।’

শুধু কৃষিশ্রমিক নয়, রিকশাচালকদের অবস্থাও সঙ্গীন। নগরীর বিভিন্ন স্থানে দুপুরের তীব্র রোদে রিকশা নিয়ে গাছতলায় আশ্রয় নিতে দেখা গেছে তাদের। রিকশাচালক আব্বাস উদ্দিনের ভাষ্য, ‘এত রইদোত রিকশা চলে কাহিল হয়্যা গেইনো বাহে। আয় অর্ধেকের কম হয়ে গেছে। ঘরে খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে।’

জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুরের জনজীবন। ছবি: সংগৃহীত

জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুরের জনজীবন। ছবি: সংগৃহীত

৪০০ টাকায় কি চলে?

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার খালাশপীরের দিনমজুর শফিক হোসেনের বয়স ৫০ ছাড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বেগুন ক্ষেতে নিড়ানি দেওয়ার সময় তার সঙ্গে কথা হয়। গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে তিনি জানালেন সকালের খাবারের কথা, ‘কাঁচা মরিচ দিয়া পন্তা খাছি। সব জিনিসের দাম খালি বাড়োওচে। হামারতো পন্তাও জুটাও মুশকিল হয়া গেইচে।’

তার সংসারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ১৫ বছরের ছেলে। তিনি দিনে ৪০০ টাকা মজুরি পান—যেটা দিয়ে কোনো রকমে চাল, ডাল, তেল আর সামান্য সবজি কেনা যায়। মাছ-মাংসের প্রশ্নে তিনি কেবল বললেন, ‘হামার কপালোত তিন বেলা সাদা ভাত জুটলে খুশি।’

শফিক হোসনের মতো আরও হাজারো মানুষের দিন চলে টাকার অভাবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর অপরিবর্তিত মজুরি তাদের জীবনযুদ্ধ কঠিন থেকে কঠিনতর করছে। কাজ না পেলে অনেকের সংসার চলে ধারে, আর সেই ধার শোধ করতে গিয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। একসময় তা নতুন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে

তীব্র গরমে শুধু আর্থিক সংকটই নয়, মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। রংপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা সারাবাংলাকে জানান, এ আবহাওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী নয়। শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরে যাচ্ছে, ফলে মানুষ দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ছে। বেড়েছে হিটস্ট্রোক, চর্মরোগ, ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা।

চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত পানি পান করার ও প্রয়োজন ছাড়া রোদে না বের হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এই পরামর্শ মেনে চলা কতটা সম্ভব?

জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুরের জনজীবন। ছবি: সংগৃহীত

জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ ও তীব্র তাপপ্রবাহে বিপন্ন রংপুরের জনজীবন। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ কোথায়?

উন্নয়ন গবেষক রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, রংপুর অঞ্চলের এই কর্মহীনতার সমস্যা চক্রাকারে ফিরে আসে। প্রতিবছর চৈত্র-বৈশাখ মাসে কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েন। কিন্তু এবার তাপপ্রবাহ সেই দুর্ভোগকে চরম সীমায় নিয়ে গেছে।

তাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা বলয় বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ। তবে তাৎক্ষণিক সঙ্কট মোকাবিলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও নগদ সহায়তা জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।

এ বিষয়ে শাপলা চত্বরে প্রতিদিন সকালে কাজের উদ্দেশ্যে জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পীরগাছা বামন সর্দার এলাকা থেকে আসা দিনমজুর তোহিদুল ইসলামের কণ্ঠে ফুটে ওঠে হাজারো মানুষের বেদনা, ‘চাকরিজীবীর টাকা বাড়ে, বাজারের জিনিসের দাম বাড়ে। সরকার তেলের দাম বাড়াইল, বিদ্যুতের দাম বাড়াইল। হামার মজুরের দাম বাড়ে না। হামরা বাঁচমো কেমন করি?’

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ ও অর্থনৈতিক সংকটের দোলাচলে রংপুরের খেটে খাওয়া মানুষ এখন শুধু টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, কবে ফিরবে স্বাভাবিকতা? কবে মিলবে দু’বেলা পেট ভরা খাবার? এই প্রশ্নগুলো আজও অনুত্তরিত।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর