রংপুর: রংপুরে ঈদ করতে এসে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী। রংপুর-ঢাকা রুটে বাসের টিকিটের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। সরকার নির্ধারিত ৯১০ টাকার সাধারণ বাসের টিকিট কালোবাজারে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অত্যাধুনিক এসি বাসের ভাড়া ৩০০০ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়েছে। কাউন্টারে টিকিট না থাকার কথা বলা হলেও বাইরে কালোবাজারে বেশি দামে টিকিট মিলছে, যা যাত্রীদের ফেলেছে চরম বিপাকে। এ অবস্থায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতারও করেছে।
টিকিট নেই কাউন্টারে, আছে কালোবাজারে
ঈদের পর কর্মস্থলে ফিরতে রংপুরের কামারপাড়াস্থ ঢাকা কোচস্ট্যান্ডের বিভিন্ন বাস কাউন্টারে ভোরবেলা থেকে যাত্রীদের ভিড় জমেছে। কিন্তু, অধিকাংশ কাউন্টারেই সোমবার পর্যন্ত কোনো অগ্রিম টিকিট নেই বলে জানানো হচ্ছে। তবে কাউন্টারের বাইরে গেলে দ্বিগুণ দামে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীরা বাস কাউন্টার কর্মচারীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
দ্বিগুণ ভাড়া, যাত্রীদের অভিযোগ
বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল হক তাঁর স্ত্রীসহ ঢাকায় ফেরার জন্য হন্যে হয়ে ছুটেছেন। সব কাউন্টার ঘুরেও শনিবারের মধ্যে কোনো টিকিট পাননি। অবশেষে তাকে ৯১০ টাকার সাধারণ টিকিট কালোবাজার থেকে ৩০০০ টাকায় কিনে শ্যামলী পরিবহনের বাসে উঠতে হয়েছে।
রংপুর-ঢাকা রুটে সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ৯১০ টাকা হলেও তা কার্যত অস্তিত্বহীন। পুরনো এসি বাসের টিকিট আগে যেখানে ১০০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে এখন দাম ২০০০ টাকা। ১৫০০ টাকার হুন্দাই বাসের টিকিট বেড়ে হয়েছে ২৪০০ টাকা। আর অত্যাধুনিক নতুন এসি বাসগুলোর ভাড়া উঠেছে ৩০০০ টাকায়। এই বাড়তি ভাড়া সাধারণ যাত্রীদের সাধ্যের বাইরে।
কালোবাজারে টিকিট পাচার ও গ্রেফতার
যাত্রীদের অভিযোগ, বেশিরভাগ কাউন্টারে টিকিট বিক্রি না করে কালোবাজারে পাচার করা হচ্ছে। এতে করে কাউন্টার কর্মচারীরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) নগরীর মর্ডান মোড় এলাকায় শনিবার রাতে অভিযান চালিয়ে ঢাকাগামী বাসের টিকিট কালোবাজারির সময় তিনজনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বাসের টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করার মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করে আসছিল বলে স্বীকার করেছে। ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য করা এবং টিকিট সংকট সৃষ্টি করে মুনাফা অর্জনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করে এমন কোনো অপরাধ বরদাশত করা হবে না। জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
পুলিশ জানিয়েছে, ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীসেবার নামে কোনো ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা বা কালোবাজারির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালিক সমিতি ও কর্মকর্তারা যা বলছেন
এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টার ম্যানেজার মো. শফি সারাবাংলাকে জানান, ঈদের পর যাত্রীর চাপ বেড়ে যায় এবং ঢাকা থেকে সময়মতো বাস এসে না পৌঁছানোর কারণে রংপুর থেকে বাস ছাড়তেও দেরি হয়।
এনা পরিবহনের সুপারভাইজার লিমন মিয়া সারাবাংলার কাছে স্বীকার করেছেন, কালোবাজারে বাড়তি দামে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেননি। নাবিল পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার সাখাওয়াত হোসেন জানান, মালিকপক্ষ দাম বাড়িয়েছে, তাদের কিছু করার নেই।
এ ব্যাপারে বিআরটিএ রংপুরের সহকারী পরিচালক শফিকুল আলম সরকার সারাবাংলাকে জানান, নন-এসি বাসের টিকিটের মূল্য সরকার নির্ধারিত। যাত্রীদের হয়রানি ঠেকাতে নিয়মিত মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো হচ্ছে। নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিলাসবহুল এসি গাড়ির টিকিটের মূল্য মালিক সমিতি নির্ধারণ করে বলে জানান তিনি।
রংপুর-ঢাকা রুটের গুরুত্ব ও যাত্রীদের দুর্ভোগ
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় রংপুরের প্রায় চার লাখ মানুষ লেখাপড়া, চাকরি ও ব্যবসা নিয়ে বসবাস করেন। তাদের অর্ধেকই বিভিন্ন পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিক। ঈদের সময় এই বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে রংপুরে আসেন। কিন্তু ঈদের পর কর্মস্থলে ফিরে যেতে প্রতিবছরই পড়তে হয় চরম বিড়ম্বনায়।
প্রতিদিন কামারপাড়া কোচস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে দুই শতাধিক এসি ও নন-এসি বাস চলাচল করে। যাত্রীদের দাবি, প্রতিবছর ঈদের পর অগ্রিম টিকিট থাকলেও এবার ঈদের আগেই কাউন্টারগুলোতে টিকিট নেই বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা পরিকল্পিতভাবে যাত্রীদের হয়রানির অংশ বলেই মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।