Saturday 13 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ময়লার স্তূপে অতিষ্ঠ রংপুরবাসী / ১ দশকেও আলোর মুখ দেখেনি সোয়া ২ কোটি টাকার জৈব সার প্রকল্প

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৩ জুন ২০২৬ ০৮:১৬

ময়লা ফেলছে সিটি করপোরেশনের গাড়ি।

রংপুর: প্রতিদিন শত-শত টন মিশ্র বর্জ্য খোলা আকাশের নিচে ফেলছে রংপুর সিটি করপোরেশন। অথচ পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের জন্য সোয়া ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক প্ল্যান্টটি এক দশকেও চালু করা যায়নি। তিন দফা উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ায় কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশন এখন ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুর্গন্ধ ও দূষণে বিপর্যস্ত আশপাশের জনপদ।

পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে নগরের নাচনিয়া এলাকায় প্রায় এক একর জমির ওপর জৈব সার উৎপাদন প্ল্যান্টটি নির্মাণ করে পরিবেশ অধিদফতর। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল প্রায় সোয়া ২ কোটি টাকা। তবে পরিকল্পনা অনুযায়ী দৈনিক পচনশীল বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় বর্জ্য পৃথকীকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে প্ল্যান্টটি এখনও কার্যকর হয়নি।

বিজ্ঞাপন

তিন দফা উদ্যোগ, তিনবারই ব্যর্থ
রংপুর সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, প্ল্যান্টটি চালুর জন্য তিনবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রথম দফায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০২১ সালে ছিন্নমূল মহিলা সমিতির সঙ্গে চুক্তি করা হলেও প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্যের অভাবে সেটিও ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ‘রি গ্রিন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান মৌখিক অনুমতি নিয়ে উদ্যোগ নিলেও কার্যক্রম স্থায়ী হয়নি।

খোলা আকাশের নিচে বর্জ্যের পাহাড়
বর্তমানে প্ল্যান্টটির ২১টি প্রকোষ্ঠ প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রতিটি প্রকোষ্ঠে প্রায় ১৫ টন পচনশীল বর্জ্য ধারণের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরবরাহ না থাকায় সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। দৈনিক ২০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র ২-৩ টন পচনশীল বর্জ্য। কারণ সিটি করপোরেশন মিশ্র বর্জ্য সংগ্রহ করে, পৃথকীকরণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

ময়লার স্তূপ।

এদিকে, জৈব সার প্রকল্প অচল থাকায় নগরের ৩৩টি ওয়ার্ডের প্রায় ১০০ টন বর্জ্যের চাপ এখন কলাবাড়ি-রথবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পড়ছে। ২০১৯ সালে নির্মিত এই ডাম্পিং স্টেশনে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিন খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি দূষিত তরল মাটি ও জলাশয়ে মিশে পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, ‘নাচনিয়ায় ডাম্পিং স্টেশন শুরু হলে এর দুর্গন্ধে এখানে টেকা দায় হয়ে পড়েছিল। এখন এখানে ময়লা ফেলা বন্ধ হলেও প্রায় এক কিলোমিটার দূরের কলাবাড়ি ডাম্পিং স্টেশনের দুর্গন্ধ এদিকেও আসে।’

শুধু বর্জ্য নয়, মশার আতঙ্কও বাড়াচ্ছে সিটি করপোরেশন
শুধু দুর্গন্ধ আর দূষণই নয়, অপরিকল্পিত এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রংপুরবাসীর জন্য ডেকে এনেছে মশার উপদ্রবও। একসময় রংপুরের প্রাণকেন্দ্রে প্রবাহিত শ্যামাসুন্দরী খালটি এখন আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে, যা এডিসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মশার প্রজননক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। নগরবাসী বলছেন, আগে সন্ধ্যার পর মশার উপদ্রব বাড়লেও এখন দিনের বেলাতেও মশার আক্রমণে অতিষ্ঠ হতে হয়। শীতকালে মশার উপদ্রব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

টেকসই সমাধানের উদ্যোগ
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই প্রকল্পটি কার্যকর হয়নি।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বর্জ্য সংগ্রহ করে মিশ্র আকারে। এর ফলে প্রয়োজনীয় পচনশীল বর্জ্য সহজে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ঘাটতি এবং উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে বারবার ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে। তাই টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তি এবং জনবলের অভাব প্রকল্পটিকে স্থবির করে দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনই টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা উচিত। তা না-হলে এ নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও রংপুরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যেখানে বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ বা জৈব সারে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সেই পরামর্শ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনও চোখে পড়ার মতো নয়।’

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রাকিব হাসান বলেন, ‘সমস্যা সমাধানে এরইমধ্যে দুইটি কনসালটেশন ফার্মের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’

তবে ১০ বছরেও সচল না হওয়া প্রকল্প নিয়ে নগরবাসীর মনে সংশয়—এটি আদৌ সচল হবে তো!

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর