Tuesday 04 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

আইনি জটিলতা / ৫ বছর ধরে মর্গে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ জুলাই ২০২৬ ২০:১৮ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৬ ২২:২৩

৫ বছর ধরে মর্গে ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: আইনি জটিলতা ও পরিবারের অনাগ্রহের কারণে প্রায় ৫ বছর ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমাগারে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ। ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে সংরক্ষিত মরদেহটি এখনো শেষকৃত্যের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবার, ভারতীয় হাইকমিশন এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া মরদেহের সৎকার সম্ভব হচ্ছে না।

প্রবীর মণ্ডল (৪১) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলম বাজার এলাকার বাসিন্দা মহাদেব মণ্ডলের ছেলে।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালের নভেম্বরে ফেসবুকে পরিচিত এক নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রামে আসেন প্রবীর। সেখানে আজিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থানকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয়রা তাকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। এরপর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়। তার পোশাক থেকে উদ্ধার হওয়া ভারতীয় পাসপোর্টে দেখা যায়, তিনি ২০১৭ সালের ৩ মার্চ তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে যান। তবে এরপর কীভাবে তিনি আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেন, সে বিষয়ে মামলার নথিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। সেই থেকে মরদেহটি হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষিত রয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, তখনই মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল। একই চিঠিতে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে মরদেহ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে প্রায় ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

পাটগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু সাঈদ চৌধুরী জানান, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে পরিবার মরদেহ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত পরিবার বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের প্রত্যাবাসনে কাজ করা সমাজকর্মী শামসুল হুদা বলেন, চলতি বছরের মার্চে তিনি প্রবীর মণ্ডলের বিষয়ে জানতে পারেন। তার ভাষ্য, পরিবারের লিখিত সম্মতিপত্র ছাড়া ভারতীয় দূতাবাস প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র দেবে না। তাই পরিবারের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহের সৎকারও সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে, প্রবীরের পরিবার জানিয়েছে, ২০২১ সালে মরদেহ ফেরত আনার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তারা হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর পরবর্তী সব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেছেন।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মো. আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, পুলিশ প্রশাসনের অনুরোধে ২০২১ সাল থেকে মরদেহটি মর্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুলিশ চাইলে যেকোনো সময় তাদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, ‘পরিবারের অনাগ্রহের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে মরদেহটি সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে। যেহেতু পরিবার মরদেহ নিতে চাচ্ছে না, আমরা চিন্তা করছি এটাকে রাষ্ট্রীয়ভাবেই সকলের সম্মতিতে ও পরিবারের অনাপত্তির প্রেক্ষিতে সৎকার করতে পারি।’

মানবাধিকারকর্মী ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, ‘বাংলাদেশের নীতি-রীতি অনুযায়ী এই দেহটাকে সৎকার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এটা না করাতে একজন মৃত ব্যক্তিরও যে মানবাধিকার আছে—সেটি লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন মৃত ব্যক্তির সৎকার করার দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানেও এটি উল্লেখ আছে। আমরা মনে করি, সরকারের এই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত ছিল এবং সময়মতো এই কাজটি সম্পন্ন করা উচিত ছিল।’

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর