রংপুর: ৪৮ বছরের ইতিহাসের অবসান ঘটিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে রংপুরের একমাত্র নিয়মিত সিনেমা হল ‘শাপলা টকিজ’। দীর্ঘদিনের লোকসান এবং সাম্প্রতিক হলটিকে ঘিরে নানান বিতর্কের কারণে শুক্রবার (৩১ জুলাই) থেকে হলটির কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে মালিকপক্ষ। এর মধ্য দিয়ে বিভাগীয় এই নগরীটি পুরোপুরি সিনেমা হলশূন্য হয়ে গেল।
শনিবার (১ আগস্ট) রাতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন হল ব্যবস্থাপক শাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, হলটির আয় দিয়ে ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের বোঝা এতটাই ভারী হয়ে উঠেছিল যে, হল চালানো আর সম্ভব ছিল না। হলটির শেষ প্রদর্শিত চলচ্চিত্র ছিল ‘বলবো কথা বাসর ঘরে’।
অনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগও ছিল বন্ধের কারণ
শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, হলটি বন্ধের পেছনে রয়েছে আরও একটি বিতর্কিত অধ্যায়। গত ১৯ এপ্রিল শাপলা সিনেমা হলের তৃতীয় তলায় বিশেষভাবে তৈরি কক্ষ থেকে অনৈতিক কার্যক্রমের অভিযোগে ৩৭ জনকে আটক করে পুলিশ। এই ঘটনার পর থেকেই হলটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল।
হল মালিকপক্ষের প্রতিনিধি সাইদুর রহমান সুমন এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘হলটি ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছিলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক কামাল হোসেন। কিন্তু লোকসান ঠেকাতে গিয়ে তিনি চুক্তি ভঙ্গ করে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এতে মালিক পরিবারের মান-সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ায় তারা হলটি বন্ধ করতে বাধ্য হন। রংপুর চেম্বারের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের পরই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
‘শাপলা টকিজ’ একসময় ছিল রংপুরের গর্ব
১৯৭৮ সালের ১৬ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহে আলম শাপলা টকিজ উদ্বোধন করেন। ‘বসুন্ধরা’ সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে রংপুর শহরের তেঁতুলতলায় (বর্তমান শাপলা চত্বরে) যাত্রা শুরু করে এই হলটি। প্রতিষ্ঠাতা নজরুল ইসলাম মাসুম সুস্থ বিনোদনের জন্যই এই হল নির্মাণ করেছিলেন। আধুনিক সাজসজ্জা ও ভালো পরিবেশের কারণে এটি দর্শকপ্রিয়তায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল। তখন রংপুরের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও দর্শকরা এই হলে সিনেমা দেখতে আসতেন।
শেষ হলো ৪৮ বছরের অধ্যায়
রংপুরের সিনেমা হলগুলোর ইতিহাস বেশ পুরোনো। এখানকার প্রথম সিনেমা হল ছিল মডার্ন হল। সেটি বন্ধ হওয়ার পর একে একে গড়ে ওঠে শাপলা টকিজ, দরদী হল, ওরিয়েন্টাল, লক্ষ্মী টকিজ, নূর মহল (আকাশ সিনেমা হল), চায়না টকিজ, সেনা হলসহ মোট ১০টি সিনেমা হল। দেড় যুগ আগেও রংপুর শহরে এই ১০টি সিনেমা হল সক্রিয় ছিল। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষতা এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে একে একে সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালেও শাপলা টকিজ, দরদী ও লক্ষ্মী সিনেমা হলে সিনেমা চলছিল, তার পরেই বন্ধ হয়ে যায় দু’টি। টিকে ছিল শুধু শাপলা টকিজ।
এর আগে ২০২২ সালে প্রায় তিন মাস বন্ধ থাকার পর ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ ২’ সিনেমা দিয়ে ফের চালু হয়েছিল শাপলা টকিজ। তবে এবার যেন আর ফিরে আসার অবকাশ নেই। দীর্ঘ ৪৮ বছরের পুরোনো এই হলের প্রবেশফটকে এখন শুধু তালা ঝুলছে। এর মধ্য দিয়ে রংপুরের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ইতিহাসে এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।