রংপুর: রংপুর বিভাগের আট জেলার কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অথচ এখানে ৩৯টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ১৬টিই বিকল হয়ে আছে। বাকি ২৩টি পুরনো মেশিন দিয়ে দিনে মাত্র ৭২ জন রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হলেও প্রতিদিন আসেন শতাধিক রোগী। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনীয় উপকরণ (সিরিঞ্জ, পাইপ, ওষুধ, পানি) সরবরাহ না থাকায় রোগীদের তা বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে— যার খরচ প্রতিবার প্রায় ৩ হাজার টাকা।
২০১০ সালে ৩৯টি মেশিন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিট। ১৬ বছর পেরিয়ে এখন সেই মেশিনগুলোর অর্ধেকের বেশি অকেজো। অচল ১৬টি মেশিনের মধ্যে কয়েকটি গত পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। অথচ রংপুর বিভাগের প্রায় দুই কোটি মানুষের মধ্যে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার মধ্যে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয় শতকরা ২০-২৫ ভাগ রোগীর।
দৈনিক রোগী ১০০+, সেবা পাচ্ছেন ৭২
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সচল ২৩টি মেশিন দিয়ে প্রতিদিন তিন শিফটে সর্বোচ্চ ৭২ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব। কিন্তু প্রতিদিন গড়ে ১০০-১২০ জন রোগী এই সেবা নিতে আসেন। ফলে প্রতিদিনই ৩০-৪০ জন রোগী ফিরে যেতে বাধ্য হন। সেই সঙ্গে পুরনো মেশিনগুলো ঘনঘন বিকল হয়। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ—অনেক সময় ডায়ালাইসিস শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। তখন সেই রোগীর সেদিনের মতো ডায়ালাইসিস বন্ধ থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।
উপকরণ না থাকায় রোগীদের দ্বিগুণ খরচ
সরেজমিনে জানা যায়, ডায়ালাইসিসের জন্য প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসার (কৃত্রিম কিডনি), ব্লাড লাইন, স্যালাইন, হেপারিন (রক্ত জমাট বাঁধা রোধক ওষুধ), সিরিঞ্জ, জীবাণুনাশক পানি—এসব কিছুই এখন রোগীদের নিজেদের কিনতে হচ্ছে। আগে হাসপাতাল থেকেই সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে প্রতি সেশনের উপকরণ কিনতে খরচ হয় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা।
জানা গেছে, সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস প্রয়োজন— মাসে ৮ বার হলে খরচ প্রায় ২৪ হাজার টাকা। আর প্যাকেজ সুবিধায় একজন রোগী ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ৪৮ বার ডায়ালাইসিস করাতে পারেন, যা কার্যত অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। এতে দরিদ্র রোগীরা সপ্তাহে দুইবারের বদলে মাসে একবার বা দুইবার ডায়ালাইসিস করছেন, যা প্রাণঘাতী।
রোগীদের করুণ কাহিনী
ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা থেকে আসা নাজমা আক্তারের (৬০) মনে শুধুই ক্ষোভ। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘উপকরণ কিনতে না পারায় আমার ডায়ালাইসিস হচ্ছে না। এখন হাঁটাচলাও করতে পারছি না।’
এদিকে নীলফামারীর জলঢাকার সাখাওয়াত হোসেন অনেকটা জিম্মি হাসপাতালের কাছে। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাসে আট বারের বদলে চার বার করছি। শরীরের অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে মারা যাব।’
আর লালমনিরহাটের পাটগ্রামের সফুরা বেগম ও গাইবান্ধার অহেদ আলী জানান, গরু-ছাগল ও সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করে ডায়ালাইসিস করছেন। এখন আর কিছুই বাকি নেই।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আবুল কালাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সপ্তাহে দু’বার ডায়ালাইসিস না করলে বাঁচার আশা নেই। কিন্তু উপকরণ কিনতে না পেরে অনেক দিন চিকিৎসা করাতে পারছি না। ডাক্তার বলেছেন, নিয়মিত না করলে বিপদ। কিন্তু সামর্থ্য নেই।’
চিকিৎসক-নার্সদের ভাষ্য
ডায়ালাইসিস ওয়ার্ডের নার্স মো. রানা সারাবাংলাকে জানান, বর্তমানে ২৩টি মেশিন চালু আছে। কিন্তু উপকরণ সরবরাহ না থাকায় অনেক দরিদ্র রোগী ডায়ালাইসিস করাতে পারছেন না। আগে রোগীর চাপে জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হতো, এখন উপকরণের অভাবে রোগী কমে গেছে।
ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. আনিসুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৬ বছরের পুরনো যন্ত্রপাতি নিয়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেশিনগুলো বিকল হচ্ছে। নতুন মেশিন ও যন্ত্রাংশের জোগান দ্রুত প্রয়োজন।’
এদিকে রোগী ও চিকিৎসকরা দাবি তুলেছেন অচল ১৬টি মেশিন দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপনের। সেই সঙ্গে ডায়ালাইসিসের সব উপকরণ হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে সরবরাহ, দরিদ্র রোগীদের জন্য বিশেষ ভর্তুকি বা বিনামূল্যে প্যাকেজ, বিভাগের অন্যান্য জেলায় ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন এবং নতুন আধুনিক মেশিন ক্রয় ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থার দাবি তোলা হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যা বলছে
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডায়ালাইসিসের উপকরণ সরবরাহ করতে আমরা স্বাস্থ্য অধিদফতর ও সিএমএসডি (সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোর ডিপো) বরাবর বারবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। তবে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে রোগীদের এই বাড়তি খরচ কমবে। অচল মেশিনগুলো মেরামত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, কিন্তু সীমিত বাজেটে সবকিছু সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা মাত্র সাতটি, যা আন্তর্জাতিক মানের (প্রতি ১০ লাখে ২০টি) চেয়ে অনেক কম। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। ডায়ালাইসিস সেবা পেতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ছুটছেন বিভিন্ন হাসপাতালে, কিন্তু সক্ষমতা অপ্রতুল।
জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ ব্যয় হয় কিডনি রোগ ব্যবস্থাপনায়, যা অত্যন্ত নগণ্য। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এই খাতে বাজেটের ২-৩ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডায়ালাইসিস সেবাকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আওতায় আনতে হবে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতি বাস্তবায়নে ডায়ালাইসিস সেবা বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে দেওয়ার দাবি উঠেছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ মাহামুদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘রংপুর বিভাগের ৮ জেলার প্রায় দুই কোটি মানুষের একমাত্র নির্ভরস্থান এই হাসপাতাল। কিন্তু এখানে সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করায় রোগীরা পড়েছেন অসহায় অবস্থায়। প্রতি মাসে ডায়ালাইসিস খরচ ২০-২৫ হাজার টাকা— যা গ্রামীণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব। অনেকে এরই মধ্যে চিকিৎসা ছেড়েও দিয়েছেন। অনেকে সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করে চলছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দৃষ্টি এখন এই সমস্যার দিকে দেয়া উচিত— অন্যথায় প্রতিদিন প্রাণ হারাবেন অসংখ্য কিডনি রোগী।