Sunday 17 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা
হামের টিকার সংকট ছিল না, অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রাদুর্ভাব

‎‎স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৯ মে ২০২৬ ২০:১৯

ঢাকা: দেশে হামের টিকার কোনো সংকট ছিল না। ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দেশে হামের ২২ লাখ টিকা আসে। আর এই টিকা ইপিআর এ মজুত ছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনার কারণে সেগুলো ঢাকার বাইরে বণ্টন করা হয়নি। কাজেই টিকা নয়, বরং অব্যবস্থাপনার কারণে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

শনিবার (৯ মে) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত ‘হামের প্রাদুর্ভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে টিকা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক গবেষক (আইসিডিডিআর,বি) ডা. তাজুল ইসলাম এ বারি বলেন, টিকার ঘাটতির কথা জানানোর পর টিকা ক্রয় করা হয়। আর সেই টিকার প্রথম চালান আসে ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। ওই সময় ২২ লাখ টিকা আসে। আর ওই টিকার দ্বিতীয় চালান আসে গত ৫ মে। আর ওই টিকা ঢাকার বাইরে না পাঠিয়ে ইপিআর এ মজুত করে রাখা হয়।

বিজ্ঞাপন

টিকার অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর বলেন, মাঠে টিকা নাই সেটা সত্যি। কিন্তু ইপিআর এ টিকা মজুত ছিল। মহাখালী থেকে টিকা নিয়ে গাড়ি নড়ে না, কারণ তেল নেই। তেলের পয়সা নাই দেখে টিকা জেলাগুলোতে গেল না। কথা হচ্ছে টিকা ছিল নাকি ছিল না, টিকা অবশ্যই ছিল কিন্তু গাড়ির তেলের পয়সা নাই সেই কারণে এই টিকা পৌঁছানো হয়নি। আবার জেলাগুলো ও উপজেলা থেকে যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকা নিয়ে যায় তাদের টাকা দেওয়া হচ্ছে না, না খেয়ে তারা কয়দিন কাজ করবে। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে টিকা না পৌঁছানোয় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকার যে চেষ্টা করছে সেটা জোড়াতালি। করোনার সময়েও এমনটা দেখেছি। সাপ্লাই চেইনে যে কর্মীরা আছে তাদের স্থায়ী না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনবার আন্দোলন করতে দেখেছি তাদের। সিস্টেমে যেখানে গ্যাপ আছে সেটা দূর করতে হবে। সবার কেন ঢাকায় আসতে হবে। কারণ, ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নাই। বলা হয় সব চিকিৎসা ফ্রী। এখানে তো সব চিকিৎসা নাই, ঔষধ নাই, এটা নাই-ওটা নাই। এই দায়ভার শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। যতগুলো সরকার ছিল সবাই দায়ী।

বিএমইউ এর শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, ৯ মাসের নিচে এমন ৩৩% শিশু হামে আক্রান্ত। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর রেশিও ৪৫% থেকে কমে বর্তমানে ৩৬% এ দাঁড়িয়েছে। আর ৬ মাস পর ৫৬% শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো হয়। তবে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় কোনো মা আক্রান্ত হলে নবজাতকের অবস্থা অনেক খারাপ হতে পারে। এমনকি, নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম হতে পারে।

ইউনিসেফের হেলথ ম্যানেজার (ইমিউনাইজেশন) ড. রিয়াদ মাহমুদ বলেন, রুটিন ইপিআই কার্যক্রমে অন্তত ১৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা যাচ্ছে না। সময় মতো রুটিন টিকা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে হামের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব নয়।

মায়ের বুকের দুধ পানের গুরুত্ব তুলে ধরে ড্যাবের মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সচেতনতা, বুকের দুধ পান ও পুষ্টি বাড়ানো গেলে হামের প্রাদুর্ভাব কমে যেত। ব্রেস্ট ফিডিং কমে যাওয়ার প্রাদুর্ভাব হলো হাম। ৬ মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খেলে ওই বাচ্চার কোনো রোগ হয় না।
এদিকে ডিজি অফিস থেকে এখনও অনেক তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ, সেখানে দোসররা বসে আছে। শতকোটি টাকার আইসিইউ যন্ত্রপাতি সেগুলো ঢাকার বাইরে পাঠানো হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে। কারণ আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নাই। বর্তমান সরকার দেশে হামের টিকা দিয়ে ৯৫ ভাগ কাভার করেছে। সরকার স্বাস্থ্য সেবায় অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে অনেক রোগ বালাই কমে আসবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য সেবা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের ক্যাম্পেইনে অনেক শিশু কভারেজের বাইরে ছিল। সেই কারণেই আজকের এই প্রাদুর্ভাবের চিত্র। আমরা আশা করছি যথাযথভাবে হাম মোকাবিলা করব।

বৈঠকে অভিযোগ করে বক্তারা আরও বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ বলছে, ২০২১ সাল থেকে ডিজিস বাড়ছে, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও ডিজিস বাড়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকা নিতে দেয় না।

গোলটেবিল বৈঠকের সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি প্রতীত ইজাজ। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএইচআরএফ এর সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ। এসময় হাম পরিস্থিতি নিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তুলে ধরেন বিএইচআরএফ এর সাংগঠনিক সম্পাদক তবিবুর রহমান।

বৈঠকে ‘হামের বর্তমান পরিস্থিতি: ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক কি-নোট উপস্থাপনা করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পিডিয়াট্রিক ইনফেকশন ডিজিজের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা জিয়াউল ইসলাম।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর