ঢাকা: স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত হাওরাঞ্চল ঘিরে কার্যকর ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
রোববার (১৭ মে) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে নেত্রকোণা সাংবাদিক ফোরাম-ঢাকা আয়োজিত ‘হাওরের দুর্যোগ: চাষাভুষার সন্তান গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, হাওরের মানুষ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যুগের পর যুগ অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। কিন্তু যারা হাওরাঞ্চল নিয়ে কাজ করছেন, তারা কতটুকু করবেন- তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। কেননা হাওরাঞ্চলের ভুক্তভোগী মানুষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেক সময় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সংসদদের সঙ্গেও আলোচনা করার প্রয়োজন অনুভব করেন না সংশ্লিষ্টরা। এ সময় তিনি হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নাই বিবেচনা করে একটি স্পেশাল টাস্কফোর্স গঠন করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, এখন আবার নতুন আরেকটি নিয়ম চালু হয়েছে, যেখানে কৃষকের কাছ থেকে ৪৩ কেজিতে মন নেওয়া হচ্ছে কিন্তু মজুদদাররা সেটাকে ৪০ কেজিতে এক মণ হিসাব করে দাম দিচ্ছে। কৃষকদের ওপরে এই যে সিস্টেমেটিক্যালি অত্যাচার ও নিপীড়ন করা হচ্ছে, সেই জিনিসগুলো জাতীয়ভাবে অ্যাড্রেস হচ্ছে না।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নেত্রকোণা জেলা বিএনপির সভাপতি ও সংসদ সদস্য ড. আনোয়ারুল হক বলেন, হাওর জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতে পড়ে, তাই হাওর রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এ সময় তিনি হাওর অধিদফতরের কাজের সমালোচনা করে বলেন, হাওরে যত উন্নয়ন হয়েছে বাস্তবিক অর্থে উন্নয়নের নামে ক্ষতি সাধন হয়েছে এবং সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা গেছে শুধুমাত্র হাওরাঞ্চলের রাস্তা মেরামতে। বিগত সময়ে হাওরের উন্নয়ন সাধনে লুটপাট হয়েছে কিন্তু হাওরবাসীর কোনো উন্নয়ন হয়নি।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ব্যক্তি স্বার্থে উন্নয়ন যদি সামষ্টিক ক্ষতি হয়, সেই উন্নয়ন রাষ্ট্রের কোনো মঙ্গল আনে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি হাওরাঞ্চলে যে দৃশ্যমান উন্নয়ন করেছেন- তা জীববৈচিত্র্যের জন্য বর্তমানে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলে ফসলহানি বা মৎস্যসম্পদ ধ্বংস কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, ভুল কৃষিনীতি, অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নির্বিচার উন্নয়নের ফলে এই সংকটগুলো তৈরি হয়। হাওরের ফসল রক্ষার জন্য প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়া হলেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বাঁধগুলো স্থায়ী হয় না। সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং নিম্নমানের কাজের ফলে অকাল বন্যায় কৃষকদের বোরো ফসল তলিয়ে যায়। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ডের কারণে হাওরের জীববৈচিত্র্য, মাছ এবং দেশীয় জলজ সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় হাওরের নদী খনন করা, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা, স্থানীয় কৃষকদের যুক্ত করে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার তদারকি করা এবং হাওরের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি।