ঢাকা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে দেশের সফটওয়্যার খাতের বাণিজ্যিক সংগঠন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)। মন্ত্রণালয় থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য বেসিস ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ সদস্যকে পরিকল্পিতভাবে ভোটার তালিকার বাহিরে রেখেছে। সেক্ষেত্রে মাত্র ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ সদস্য বেসিসের ভোটার তালিকায় রয়েছেন। এটিকে সংগঠনের ইতিহাসে নজীরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন বেসিস সদস্যরা।
তাদের অভিযোগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা বেসিস নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এসব কর্মকর্তারা বেসিসের নির্বাচন পরিচালনা ও আপিল বোর্ড একটি প্রহসনের নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, অত্যন্ত অস্পষ্ট ও অযৌক্তিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিয়ে এই বিপুল সংখ্যক উদ্যোক্তাকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
অনেকের অভিযোগ, আপিল শুনানিতে সশরীরে উপস্থিত হওয়ার পরও নথিপত্রে আপিল সাবমিট করা হয়নি লিখে তাদের আবেদন নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ ও সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার পরও এভাবে নাম কেটে দেওয়াকে উদ্যোক্তারা বৈষম্যমূলক এবং অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যা দিয়েছেন। সেইসঙ্গে এটাকে তারা ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে তুলনা করেছেন।
তালিকা থেকে বাদ পড়া সদস্যরা বলেছেন, দশম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ অসনের মধ্যে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। সেই নির্বাচন আইনগতভাবে বৈধ হলেও, সেটা ছিল প্রতারণা। ঠিক তেমনি বেসিসের ২ হাজার ৮০৫ জন সদস্যর মধ্যে মাত্র ৯৩৫ জনকে ভোটার করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরেকটা প্রহসের নির্বাচন করতে চাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিস্ট সিন্ডিকেট বিএনপি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছে। এ অবস্থায় উদ্যেক্তারা অবিলম্বে বেসিসের আপিল ও নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড বাতিল এবং নতুন করে ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ও বেসিস নির্বাচন আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান মুর্শেদা জামান রোববার (১৭ মে) তার নিজ দফতরে কথা বলেন সারাবাংলার এই প্রতিনিধির সঙ্গে। বেসিসের ২ হাজার ৮০৫ জন সদস্যর মধ্যে তালিকায় মাত্র ৯৩৫ জন ভোটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা আইনগতভাবে সবকিছু করেছি। নতুন করে কোনো সদস্যকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই।’
অনেক সদস্য সময়মতো মেইল না পাওয়া চাদাঁ দিতে ২/১ দিন দেরি হয়েছে- এদের আপিলও আমলে নেওয়া হয়নি কেন? এর উত্তরে মুশের্দা জামান বলেন, ‘যারা চাঁদা দিতে দেরি করেছেন, তাদের আপিল আমলে নেওয়া হয়নি।’ তাহলে আপিল বোর্ডের কাজ কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা কেবল ছোটখাটো কাগজপত্র সময় মতো জমা দেয়নি, তাদের আপিল গ্রহণ করা হয়েছে।’
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ও বেসিস নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান তানিয়া ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভোটার তালিকা থেকে কেউ বাদ পড়লে এ বিষয়ে আমার কোনো করণীয় নেই। এটা দেখছেন আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান।’
আইসিটি খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নির্বাচনে বিশেষ কোনো পক্ষকে বাড়তি সুবিধা পাইয়ে দিতেই ভোটার তালিকায় এই ধরণের কারসাজি করা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অংশীজনরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত পুরো শিল্পখাতে তীব্র অনাস্থা ও বিভাজন তৈরি করছে, যা বেসিসের মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশাদার সংগঠনের ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বৈধ সদস্যদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ আইসিটি উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে, বেসিসের আগামী নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা দুই তৃতীয়াংশ সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে চারটি ভিন্ন ক্যাটাগরির মোট ১ হাজার ৯৪৭টি কোম্পানি এবার ভোটাধিকার হারাচ্ছে। এর মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘ইনভ্যালিড’ বা অবৈধ এবং ১ হাজার ৩৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে ‘কোয়ারেন্টাইন’ তালিকায় রাখা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, বেসিসের মোট সদস্য ২ হাজার ৮০৫ জন। এর মধ্যে ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেছে মাত্র ১ হাজার ৫০৮ জন। বাকি ১ হাজার ২৯৭ জন আবেদনই করেননি। তাদের অভিযোগ, এই আপিল বোর্ড ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছে। তারা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে নির্বাচিত করার জন্য কাজ করছে। ফলে সাধারণ সদস্যদের এই অপিল বোর্ড ও নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডের প্রতি কোনো আস্থা নেই। এ কারণে তারা ভোটার হওয়ার জন্য আবেদনই করেনি।
উল্লেখ্য, ভোটার হতে আবেদন করা ১ হাজার ৫০৮ জনের মধ্যে ৬৯৩ জনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে মাত্র ৩৬৫ জন আপিলের জন্য আবেদন করেছেন। আর আপিল বোর্ডের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে ৫২৮ জন সদস্য আপিল-ই করেননি। অন্যদিকে আপিলকারীদের মধ্য থেকে ৩২০ জনকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করায় চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছেন ৯৩৫ জন।