Sunday 09 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

যুক্তরাষ্ট্রের হরমুজ অবরোধ, কতদিন টিকে থাকতে পারবে ইরান?

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০০:৪২ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ০২:৫৪

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন ইরান ‘আর্থিকভাবে ভেঙে পড়ছে’ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধের কারণে দেশটি প্রতিদিন কোটি কোটি ডলার হারাচ্ছে। তবে, বাস্তব চিত্র আরও জটিল ও বহুমাত্রিক। একদিকে অবরোধ ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে তেল আয়ের প্রবাহ, বিকল্প কৌশল এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশটিকে দ্রুত ভেঙে পড়া থেকে এখনো দূরে রাখছে।

অবরোধ ও পাল্টা পদক্ষেপ

১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ শুরু করে। এর মধ্যে একটি ইরানি ট্যাংকারে গুলি চালানো ও জব্দ করার ঘটনাও ঘটে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানে যাওয়া-আসা করা জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়া হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এটিকে “অবৈধ কাজ ” বলে অভিহিত করেছে, যা “সমুদ্র দস্যুতার শামিল”।

বিজ্ঞাপন

হরমুজ প্রণালিতে দুই মার্কিন রণতরী। ছবি: সংগৃহীত

 

এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বিদেশি জাহাজের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং কয়েকটি জাহাজ আটক করে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট করে জানায়, হরমুজে নিরাপত্তা আর “বিনামূল্যে” দেওয়া হবে না। এর আগে ইরান যেসব দেশকে ‘বন্ধু’ মনে করত, সেগুলোকে চলাচলের অনুমতি দিত।

১৯ এপ্রিল ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, ‘হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিনামূল্যে নয়।” তিনি এক্সে লিখেছেন, “অন্যদের জন্য বিনামূল্যে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করা সম্ভব নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘হয় সবার জন্য মুক্ত তেলবাজার হবে, নয়তো সবার জন্য বড় ধরনের খরচের ঝুঁকি বাড়বে। বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে ইরান ও তার মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের নিশ্চিত ও স্থায়ী অবসানের ওপর।’

বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনার প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অবরোধ ইরানকে আঘাত করছে সত্যি, তবে দেশটির এটি সহ্য করার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতা রয়েছে।

ছবি: সিএনএন

চাপের মধ্যেও তেল রপ্তানি ও আয় বেড়েছে

ইরান সমুদ্রপথে তেল, গ্যাস এবং পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্যসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ—বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে—এই বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান কর্তৃপক্ষ কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা উপসাগর থেকে বের হওয়ার একমাত্র জলপথ এবং শান্তিকালে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

এই গুরুত্বপূর্ণ পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, এবং এরপর থেকে ইরান প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। তবে একই সঙ্গে সে নিজের জ্বালানি পণ্যও এই পথ দিয়ে রপ্তানি চালিয়ে গেছে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি তার মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ। কেপলার নামের একটি বাণিজ্য গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ইরান দৈনিক ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে এবং এপ্রিলে এখন পর্যন্ত ১৭ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল পাঠিয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালে গড় ছিল ১৬ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল।

১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইরান ৫ কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। ইরানি তেলের তিনটি প্রধান ধরন—ইরানিয়ান লাইট, ইরানিয়ান হেভি ও ফোরোজান ব্লেন্ড—এর দাম গত এক মাসে প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলারের নিচে নামেনি এবং অনেক দিনই ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার হিসাবেও গত এক মাসে ইরান অন্তত ৪.৯৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এর বিপরীতে যুদ্ধের আগে ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইরান দৈনিক প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার বা মাসে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার আয় করছিল।

সহজভাবে বলতে গেলে, যুদ্ধের আগের তুলনায় গত এক মাসে ইরান তেল রপ্তানি থেকে ৪০ শতাংশ বেশি আয় করেছে। এই আয় বন্ধ করাই যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

হরমুজ প্রণালী। ছবি: সংগৃহীত

অবরোধের প্রভাব

১৪ এপ্রিল আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক শ্নাইডার বলেন, আগের ছয় সপ্তাহ ইরানের জন্য তেল আয়ের ক্ষেত্রে লাভজনক ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে তা বদলে যাবে।

তিনি বলেন, “ইরানের কাছে ভাসমান ট্যাংকারে মজুত তেলের কিছু রিজার্ভ রয়েছে—যার পরিমাণ ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল ছিল। তবে এর মানে এই নয় যে অবরোধ ইরানকে আঘাত করবে না।”

শুক্রবার তিনি বলেন, ইরান “দীর্ঘমেয়াদি কৌশল” নিয়ে খেলছে এবং এ ধরনের সংঘাতের জন্য কিছুটা প্রস্তুত ছিল।

তিনি বলেন, “নৌ অবরোধ অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে, কারণ আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেশ কিছু বেসামরিক জাহাজ আটক করা হয়েছে। তবে অবরোধ কতটা কঠোর, কত জাহাজ পাড়ি দিতে পারছে এবং ট্রাম্প কতদিন এটি বজায় রাখতে পারবেন—তা এখনও পরিষ্কার নয়।”

যুক্তরাষ্ট্র কতদিন অবরোধ চালিয়ে যেতে পারবে?

শ্নাইডার বলেন, ১ মে’র পর ট্রাম্প আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন, কারণ কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া বিদেশে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হবে। তিনি বলেন, অবরোধ কার্যকর রাখা জাহাজগুলোতে কঠিন পরিস্থিতির খবর পাওয়া গেছে এবং চীন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

“চীন ইতোমধ্যে বলেছে, ইরানের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যে অবরোধ গ্রহণযোগ্য নয়,” তিনি বলেন। তিনি আরও বলেন, “দুই পক্ষের আচরণ থেকে যদি কিছু বোঝা যায়, তা হলো ইরান ধৈর্য দেখাচ্ছে, আর ট্রাম্প অধৈর্যতা দেখাচ্ছেন।”

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাডাম এরেলি বলেন, ইরান এই পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং বিকল্প ব্যবস্থাও তাদের আছে। তিনি বলেন, “ইরান কঠিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও টিকে থাকতে পারে—সম্ভবত ট্রাম্প বা মার্কিন জনগণের ধৈর্যের চেয়েও বেশি সময়।”

ইরান যুদ্ধে অপরিশোধিত তেল বাজার অস্থির

ইরান যুদ্ধে অপরিশোধিত তেল বাজার অস্থির

ইরান কি তেল সংরক্ষণ করতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ইরানকে আরও বেশি তেল মজুত করতে হচ্ছে, ফলে সংরক্ষণস্থল সংকট দেখা দিতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ ক্ষমতা প্রায় ২০ দিনের উৎপাদন ধারণ করতে পারে। খার্গ দ্বীপে একটি পুরোনো ট্যাংকার আবার চালু করে তেল সংরক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

ইরান কি তেল থেকে আয় চালিয়ে যেতে পারবে?
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রে থাকা তেলের মজুত থেকে ইরান কয়েক মাস আয় চালিয়ে যেতে পারবে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জাহাজে ভাসমান অবস্থায় ১৬০-১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল রয়েছে। এই মজুত থেকে আগস্ট পর্যন্ত আয় চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তেল ছাড়াও কীভাবে আয় করছে ইরান?

তেল ছাড়াও, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলের ওপর আরোপ করা টোল থেকেও ইরান আয় করছে। কিছু জাহাজ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানা গেছে।

ইরানের নেতৃত্ব কতটা স্থিতিশীল?

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি সত্ত্বেও ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তাদের মতে, সংকটের সময় তারা “এক পতাকার নিচে এক হাত” হয়ে কাজ করছে।

সামরিকভাবে ইরান কতটা শক্তিশালী?

ইরান গেরিলা কৌশল, সাইবার হামলা এবং প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধ দেখিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে এবং নৌ চলাচলে বাধা দিয়ে বৈশ্বিক তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে,  যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করলেও তাৎক্ষণিকভাবে দেশটিকে ভেঙে ফেলতে পারেনি। বরং তেল আয়ের প্রবাহ, বিকল্প মজুত এবং কৌশলগত ধৈর্য ইরানকে এই সংকটে টিকে থাকার সুযোগ দিচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে, এই লড়াই শুধু সামরিক নয়—এটি অর্থনীতি, কৌশল ও সময়ের লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে ইরান আপাতত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দৃঢ়তা দেখাচ্ছে। ইরানের অতীত অভিজ্ঞতা থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ সহ্য করতে সক্ষম এবং সহজে নতি স্বীকার করবে না দেশটি।


আলজাজিরার বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ।

সারাবাংলা/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর