Sunday 09 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

উইটনি হিউস্টন: সুরের মেজাজ ও বিষাদের এক অপরাজেয় অপ্সরী

সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৯ আগস্ট ২০২৬ ১৬:১৩ | আপডেট: ৯ আগস্ট ২০২৬ ১৬:১৬

১৯৮৫ সালের এক সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্কের এক নৈশক্লাবের মঞ্চে আলো এসে পড়ল এক তরুণীর ওপর। মিষ্টি হাসির সেই চেনা মুখ, কিন্তু যখনই তিনি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রথম সুরটি তুললেন, গোটা ঘরজুড়ে এক অলৌকিক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। গান নয়, যেন এক ঐশ্বরিক কণ্ঠের ঝড় ভেঙে পড়ল উপস্থিত শ্রোতাদের ওপর। সংগীত প্রযোজক ক্লাইভ ডেভিস সেই রাতে বুঝে গিয়েছিলেন, তিনি এমন এক কণ্ঠকে আবিষ্কার করেছেন যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে নতুন রাজত্ব তৈরি করবে। প্রথাগত পপ এবং আর-অ্যান্ড-বির সমস্ত গণ্ডি ভেঙে দিয়ে সেই রাতে জন্ম নিয়েছিলেন পপ সংগীতের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী কণ্ঠ উইটনি হিউস্টন, যাকে বিশ্ববাসী পরবর্তীতে ভালোবেসে নাম দিয়েছিল কেবল ‘দ্য ভয়েস’।

বিজ্ঞাপন

১৯৬৩ সালের ৯ আগস্ট নিউ জার্সির নিউয়ার্কে এক ঐতিহাসিক সংগীত পরিবারে জন্ম নেন উইটনি এলিজাবেথ হিউস্টন। তার মা সিজি হিউস্টন ছিলেন প্রখ্যাত গসপেল গায়িকা, আর তার খালা ডিওন ওয়ারউইক এবং ধর্মমাতা ছিলেন স্বয়ং অরেথা ফ্র্যাঙ্কলিন। শৈশব থেকেই নিউ আর্কের নিউ হোপ ব্যাপটিস্ট চার্চে গসপেল গায়ক হিসেবে তার সংগীতের হাতেখড়ি। চার্চের ক্যোয়ার থেকে শুরু করে কিশোরী বয়সে ফ্যাশন মডেলিংয়ের জগতে পা রাখা সবখানেই তিনি ছিলেন অননুকরণীয়। কিন্তু তার আসল ঠিকানা ছিল মেজোরকা আর মাইনর স্কেলের সেই সুরের বিশ্ব, যেখানে পাঁচ অক্টেভের অনন্য গায়কি নিয়ে তিনি যেকোনো সাধারণ গানকে রূপ দিতে পারতেন ধ্রুপদী অমরতায়।

১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম আত্মপ্রকাশমূলক অ্যালবাম ‘উইটনি হিউস্টন’। এক অনভিজ্ঞ নতুন শিল্পীর অ্যালবাম বিশ্বজুড়ে ২৫ মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে তোলে। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সুপারহিট ট্র্যাক ‘সেভিং অল মাই লাভ ফর ইউ’, ‘হাউ উইল আই নো’, এবং ‘আই ওয়ানা ড্যান্স উইথ সামবাডি’ তাকে বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষস্থানে এমনভাবে বসিয়ে দেয়, যা কোনো নারী শিল্পী এর আগে কখনো অর্জন করতে পারেননি। তিনি একমাত্র শিল্পী যিনি টানা সাতটি গান নিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এর ১ নম্বরে থাকার ঐতিহাসিক রেকর্ড অর্জন করেছিলেন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উইটনি হিউস্টন পা রাখেন সেলুলয়েডের রূপালী পর্দায়। ১৯৯২ সালে কেভিন কস্টনারের বিপরীতে ‘দ্য বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রে তার আত্মপ্রকাশ কেবল বক্স অফিসে ঝড় তোলেনি, বরং এই চলচ্চিত্রের জন্য তার গাওয়া ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটি সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া নারী একক গানে পরিণত হয়। উচ্চ সুরের সেই তীব্র বিস্তার এবং দরদভরা টান প্রতিটি শুনানিতে শ্রোতার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ‘ওয়েটিং টু এক্সহেল’ এবং ‘দ্য প্রিচার্স ওয়াইফ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় ও গান গেয়ে তিনি নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রমাণ দেন।

ক্যারিয়ারে ছটি গ্রামি, দুটি অ্যাওয়ার্ডস অফ এমি, ৩০টি বিলবোর্ড মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত এই শিল্পীর জীবন কিন্তু কেবল আলোর আলোড়নেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের ঝড়-ঝাপটা, সম্পর্কের জটিলতা এবং নেশার গ্রাস তার সেই দ্যুতিময় কণ্ঠ ও জীবনকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। কিন্তু সমস্ত বিতর্ক আর ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে ছাপিয়েও যখন তিনি মঞ্চে উঠতেন, তার কণ্ঠের জাদুতে মুহূর্তেই ভেসে যেত সব ধূলিমলিনতা।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি লস অ্যাঞ্জেলেসের এক হোটেলে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে অকালে নিভে যায় এই সুরের শিখা। কিন্তু যে নক্ষত্র তার সুরের দ্যুতিতে পুরো পৃথিবীকে আলোকিত করে গেছে, তার মৃত্যু হয় না। উইটনি হিউস্টন আজও বেঁচে আছেন তার সুরের নিখুঁত অনুরণনে, প্রতিটি উঁচু নোটে এবং অনুভূতির শেষ বিন্দু ছুয়ে যাওয়া সেই অমর গানগুলোতে যা চিরকাল বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেবে, কণ্ঠে ঈশ্বর দিলে কীভাবে মানুষ অমর হয়ে ওঠে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি